অতঃপর তাদের অবস্থা কেমন হবে, যখন ফেরেশতারা তাদের মুখমণ্ডল ও পৃষ্ঠদেশসমূহে আঘাত করতে করতে তাদের জীবনাবসান ঘটাবে? (সূরাঃ ৪৭/ মুহাম্মাদ, আয়াত ৪৭)
বল, ‘তোমাদেরকে মৃত্যু দেবে মৃত্যুর ফেরেশতা যাকে তোমাদের জন্য নিয়োগ করা হয়েছে। তারপর তোমাদের রবের নিকট তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে’। ( সূরাঃ ৩২/ আস-সাজদাহ, আয়াত ১১ )
এখানে সূরাঃ ৪৭/ মুহাম্মাদ, আয়াত ৪৭-এ আয়াতে শুধু ফেরেশতা প্রাণ গ্রহণ করবে বলেহে। আর সূরাঃ ৩২/ আস-সাজদাহ, আয়াত ১১ এ ফেরেশতারা প্রাণ গ্রহণ করবে বলেছে। এক আয়াতে একবচন ব্যবহার করা হয়েছে, অন্য আয়তে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে।
তাহলে কি এখানে কন্ট্রাডিকশন হয়েছে?
না, এখানে কোনো কন্ট্রাডিকশন নেই। বরং দুইটি আয়াত মৃত্যুর প্রক্রিয়ার দুটি ভিন্ন দিক বর্ণনা করছে। কুরআনে অনেক জায়গায় একই কাজকে কখনো আল্লাহর দিকে, কখনো প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতার দিকে, আবার কখনো সহকারী ফেরেশতাদের দিকে সম্বন্ধ করা হয়েছে। এগুলো পরস্পরবিরোধী নয়, বরং একে অপরকে সম্পূর্ণ করে।
প্রথমে আয়াত দুটি দেখি:
সূরা আস-সাজদাহ ৩২:১১
"বল, তোমাদের প্রাণ কবজ করবে মৃত্যুর ফেরেশতা (মালাকুল মাওত), যাকে তোমাদের জন্য নিয়োগ করা হয়েছে।"
এখানে একবচন ব্যবহার করা হয়েছে, কারণ এখানে মৃত্যুর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান ফেরেশতা (মালাকুল মাওত)-এর কথা বলা হচ্ছে।
অন্যদিকে,
সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:২৭
"তখন তাদের অবস্থা কেমন হবে, যখন ফেরেশতারা তাদের মুখমণ্ডল ও পৃষ্ঠদেশে আঘাত করতে করতে তাদের প্রাণ কবজ করবে?"
এখানে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে, কারণ মৃত্যু কার্য সম্পাদনের সময় একাধিক ফেরেশতা উপস্থিত থাকে। বিশেষ করে কাফিরদের ক্ষেত্রে শাস্তিদানকারী ফেরেশতারাও থাকে, যারা তাদের মুখ ও পিঠে আঘাত করে।
এ বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে অন্য আয়াতে।
সূরা আল-আনআম ৬:৬১
"অবশেষে যখন তোমাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন আমাদের প্রেরিত ফেরেশতারা তার প্রাণ কবজ করে।"
এখানেও বহুবচন এসেছে।
আবার,
সূরা আন-নাযিআত ৭৯:১–২
"শপথ তাদের, যারা কঠোরভাবে প্রাণ টেনে বের করে, এবং তাদের, যারা কোমলভাবে প্রাণ বের করে।"
এখানেও একাধিক ফেরেশতার কাজের কথা বলা হয়েছে।
তাহলে আসল চিত্র কী?
ইসলামী আকীদা অনুযায়ী:
- আল্লাহ প্রকৃত অর্থে মৃত্যুর ফয়সালা করেন।
- মালাকুল মাওত (মৃত্যুর ফেরেশতা) সেই দায়িত্বের প্রধান।
- তার অধীনে অন্যান্য ফেরেশতা সহকারী হিসেবে কাজ করেন এবং বিশেষ করে মুমিন ও কাফিরের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
এটা ঠিক যেমন:
একটি হাসপাতালের অপারেশনের পর বলা যায়,
- "সার্জন অপারেশন করেছেন।"
আবার বলা যায়, - "ডাক্তারদের দল অপারেশন করেছে।"
দুইটিই সত্য। কারণ সার্জন প্রধান দায়িত্বে ছিলেন, কিন্তু পুরো টিমও কাজ করেছে।
আবার একটি কোম্পানির উদাহরণ ধরুন:
- "সিইও প্রকল্পটি সম্পন্ন করেছেন।"
- "কোম্পানির টিম প্রকল্পটি সম্পন্ন করেছে।"
এখানেও কোনো বিরোধ নেই। প্রথম বাক্যে নেতৃত্বের দিকটি বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বাক্যে পুরো দলের অংশগ্রহণের দিকটি বলা হয়েছে।
কাজেই, এখানে কোনো কন্ট্রাডিকশন নেই। কারণ:
- সূরা আস-সাজদাহ ৩২:১১-এ প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত মৃত্যুর ফেরেশতা (মালাকুল মাওত)-এর কথা বলা হয়েছে।
- সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:২৭-এ সহকারী ফেরেশতাসহ ফেরেশতাদের দল প্রাণ কবজ ও শাস্তি প্রদানের দৃশ্য বর্ণনা করা হয়েছে।
- একই ঘটনার নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি ও তার অধীনস্থ দলের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করা ভাষাগত ও যৌক্তিকভাবে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
অতএব, এক আয়াতে একবচন এবং অন্য আয়াতে বহুবচন ব্যবহৃত হওয়া কুরআনের মধ্যে কোনো বিরোধ সৃষ্টি করে না; বরং মৃত্যুর প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিককে তুলে ধরে।