ইসলাম কী যুন্ধবন্দী নারী কিংবা দাসীদের ধর্ষণ করার অনুমতি দেয়? 

ইসলাম কী যুন্ধবন্দী নারী কিংবা দাসীদের ধর্ষণ করার অনুমতি দেয়? 

ইসলাম কী যুন্ধবন্দী নারী কিংবা দাসীদের ধর্ষণ করার অনুমতি দেয়? 

আধুনিক সময়ে অমুসলিমরা ইসলাম নিয়ে নানা বিভ্রান্তিকর ও ভূল দাবি প্রচার করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ইসলাম ও দাস প্রথা নিয়ে তাদের মনগড়া ব্যাখ্যা, যেখানে তারা দাবি করে যে ইসলাম যুন্ধবন্দী কিংবা দাসীদের ধর্ষণ করার অনুমতি দেয়। তারা ইসলামের মূল নীতিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে, যাতে পাঠক বা দর্শকরা ইসলামকে নৈতিকভাবে অবমানিত মনে করে। এই লিখায় আমি নাস্তিকদের এই ধরনের অভিযোগ এবং দাসীর সঙ্গে সহবাস সম্পর্কিত তাদের ভুল ধারণা বিস্তারিত তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

নাস্তিকদের অভিযোগের উৎস

ইসলামে দাস-দাসী বলতে মূলত যুদ্ধবন্দীদের বোঝানো হয়। এই বিষয়ে আশা করি সকলের ধারণা আছে। যাঁরা মুসলিমদের সঙ্গে সংঘর্ষে পরাজিত হয়ে বন্দী হন, তাদের প্রতি মুসলিমদের করণীয় কী, তাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে, তাদের অধিকার কী—এসব বিষয়ে ইসলামে সুস্পষ্ট বিধান প্রদান করা আছে। নিয়মানুযায়ী যুদ্ধবন্দীদের মর্যাদা রক্ষা, সম্মান প্রদর্শন এবং ন্যায়সঙ্গত আচরণ নিশ্চিত করা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার অংশ। তেমনি একটি বিধান হলো যুদ্ধবন্দী নারীদের সাথে ইসলাম সহবাস করাকে হালাল করেছেন। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন; 

নারীদের মধ্যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ নারীগণও তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ, কিন্তু তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীদের বাদে, আল্লাহ এসব ব্যবস্থা তোমাদের উপর ফরয করে দিয়েছেন। তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ নারীদের ছাড়া অন্যান্য সকল নারীদেরকে মোহরের অর্থের বদলে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে চাওয়া তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে, অবৈধ যৌন সম্পর্কের জন্য নয়। অতঃপর তাদের মধ্যে যাদের তোমরা সম্ভোগ করেছ, তাদেরকে তাদের ধার্যকৃত মোহর প্রদান কর। তোমাদের প্রতি কোনও গুনাহ নেই মোহর ধার্যের পরও তোমরা উভয়ের সম্মতির ভিত্তিতে মোহরের পরিমাণে হেরফের করলে, নিশ্চয় আল্লাহ সবিশেষ পরিজ্ঞাত ও পরম কুশলী। (( (4:24) An-Nisa | (৪:২৪) আন-নিসা-অনুবাদ/তাফসীর ))

হাদিসে এসেছে;

পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা ১৮৯৮-[১১]

আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেক ’তাসবীহ’ অর্থাৎ সুবহা-নাল্ল-হ বলা সদাক্বাহ্ (সাদাকা), প্রত্যেক ’তাকবীর’ অর্থাৎ আল্ল-হু আকবার বলা সদাক্বাহ্ (সাদাকা), প্রত্যেক ’তাহমীদ’ বা আলহাম্‌দুলিল্লা-হ বলা সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। প্রত্যেক ’তাহলীল’ বা ’লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’ বলা সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। নেককাজের নির্দেশ দেয়া, খারাপ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখা সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। নিজের স্ত্রী অথবা দাসীর সাথে সহবাস করাও সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। সাহাবীগণ আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ যদি নিজের কামভাব চরিতার্থ করে তাতেও কি সে সাওয়াব পাবে? উত্তরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমাকে বলো, কোন ব্যক্তি যদি হারাম উপায়ে কামভাব চরিতার্থ করে তাহলে সেকি গুনাহগার হবে না? ঠিক এভাবেই হালাল উপায়ে (স্ত্রী অথবা দাসীর সাথে) কামভাব চরিতার্থকারী সাওয়াব পাবে।

(মুসলিম)[1] [1] সহীহ : মুসলিম ১০০৬, আহমাদ ২১৪৮২, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৭৮২৩, সিলসিলাহ্ আস্ সহীহাহ্ ৪৫৪, সহীহ আত্ তারগীব ১৫৫৬, সহীহ আল জামি‘ আস্ সগীর ২৫৮৮। (( মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) | হাদিস: ১৮৯৮ | Mishkat al-Masabih, Hadith No. 1898 ))

কুরআন এবং হাদিসে উল্লেখিত রয়েছে, যুদ্ধবন্দী দাসীদের সাথে সহবাস করা বৈধ। তাই নাস্তিকদের অভিযোগ ইসলাম নাকি যুদ্ধবন্দীদের ধর্ষনের অনুমতি বা ধর্ষণের বৈধতা দেয়।

ইসলাম কী আসলে যুন্ধবন্দীদের সাথে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্কের বৈধতা দেয়?

পাঠক, আপনারা যদি কুরআনের আয়াত ও হাদীসসমূহ একত্রে পর্যালোচনা করেন, তাহলে সর্বত্রই দেখতে পাবেন ইসলামে যুদ্ধবন্দী বা দাসীদের সঙ্গে সহবাসকে বৈধ, জায়েয ও হালাল বলা হয়েছে। কিন্তু অন্ধবিশ্বাসী নাস্তিকদের দাবি কী? তাদের দাবি হলো ইসলাম নাকি দাসীদের ধর্ষণের অনুমতি দিয়েছে! ভালো করে লক্ষ্য করুন—কুরআন ও হাদীসে স্পষ্ট বলা হয়েছে “সহবাস বৈধ”, কিন্তু নাস্তিকরা সেটাকেই বিকৃত করে “জোরপূর্বক ধর্ষণ” বলে প্রচার করছে। কত বড় মিথ্যাচার এটি! কোনো কিছু বৈধ হওয়ার মানে কি তা জোর করে করতে হবে? ইসলামে নারী ও পুরুষের জন্য ১৪ জন আত্মীয় ব্যতীত অন্য সবার সঙ্গে বিবাহ বৈধ। কিন্তু তার মানে কি একজন পুরুষ দুনিয়ার সব নন-মাহরাম নারীকে জোরপূর্বক বিবাহ করতে পারেন? কখনোই না। মাছ খাওয়া হালাল। কিন্তু এর মানে এই নয় যে সবাইকে মাছ খেতেই হবে। ইচ্ছা করলে খাওয়া যায়, না চাইলে নয়। আবার ইচ্ছে হলেও আপনি জোরপূর্কব অন্যের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে খেতে পারবেন না, কিংবা চুরি করে খেতে পারবেন না। আপনাকে বৈধ উপায়েই খেতে হবে। একইভাবে, দাসীর সঙ্গে সহবাস ইসলামে বৈধ বা হালাল বিষয়। এর মানে এই নয় যে তা জোরপূর্বক হতে হবে। বরং, এটি নির্দিষ্ট নৈতিক ও আইনি কাঠামোর ভেতরে, সম্মতির ভিত্তিতে বৈধ। নাস্তিকদের দাবী ইসলাম দাসীদের ধর্ষনের বৈধতা দেয়। তাই আমাদের শুরুতে ইসলামে ধর্ষণ কাকে বলে সেটা জেনে নেওয়া দরকার।

ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় ‘ধর্ষণ’ কাকে বলে?

‘ধর্ষণ’ প্রসঙ্গে অভিধানে বলা হয়েছে,

وَفِي لِسَان الْعَرَب: وَقد تَكَرَّر ذِكْرُ الغصْب فِي الحَدِيث، وَهُوَ أَخْذُ مَالِ الغَيْرِ ظُلْماً وعُدُواناً. وَفِي الحَدِيثِ (أَنَّه غصَبَها نَفْسَها) أَرادَ أَنَّه وَاقَعها كُرْها فاسْتَعَارَه لِلْجِمَاع. অর্থঃ "লিসানুল আরব"-এ বলা হয়েছে, হাদিসে "غَصْب" (জবরদখল বা বলপ্রয়োগ) বারবার এসেছে, এবং এটি অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ও জোরপূর্বক গ্রহণ করাকে বোঝায়। একটি হাদিসে এসেছে: "أنه غصَبَها نَفْسَها" এর অর্থ হলো, “সে তার সাথে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সহবাস করেছিল (বা ধর্ষণ করেছিল)” ; এবং এখানে সহবাস বোঝাতে শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। (( তাজুল ‘আরুস মিন জাওয়াহিরিল ক্বামুস – মুর্তাযা আয-যাবিদি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৮৪।(( ص484 - كتاب تاج العروس من جواهر القاموس - غشرب - المكتبة الشاملة  )) 

ইসলামী শরিয়তে ধর্ষণকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় – “একজন পুরুষের দ্বারা একজন নারীর সাথে জোরপূর্বক অবৈধ যৌন সঙ্গম, যেখানে নারী তার সাথে বৈধভাবে বিবাহিত নয় এবং তার স্বাধীন ইচ্ছা ও সম্মতি ছাড়াই এটি সংঘটিত হয়।”  (( "Forcible illegal sexual intercourse by a man with a woman who is not legally married to him, without her free will and consent"- Azman Mohd Noor (1 January 2010). "Rape: A Problem of Crime Classification in Islamic Law". Arab Law Quarterly, Vol. 24, No. 4 (2010), pp. 417-438. Rape: A Problem of Crime Classification in Islamic Law in: Arab Law Quarterly Volume 24 Issue 4 (2010) )) ইসলামী দণ্ডবিধিতে ধর্ষণকে জবরদস্তিমূলক ব্যাভিচারের আওতায় ফেলা হয়। (( দেখুনঃ মুয়াত্তা মালিক,  বিচার সম্পর্কিত অধ্যায় (كتاب الأقضية); بَاب الْقَضَاءِ فِي الْمُسْتَكْرَهَةِ مِنْ النِّسَاءِ (পরিচ্ছেদঃ ১৬. কোন স্ত্রীলোকের সাথে জবরদস্তি যিনা করিলে তাহার ফয়সালা) মুয়াত্তা মালিক | হাদিস: ১৪৩৫ | Muwatta Imam Malik, Hadith No. 1435 ))

সহবাসের ক্ষেত্রে দাসীর মতামত

নাস্তিকরা যে বলে ইসলামে দাসীদের সাথে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক করা জায়েজ। কিন্তু জোরপূর্বক সহবাস করা তো ইসলামে ধর্ষণ বা ব্যবিচার হিসবে বিবেচিত হয়। আর ইসলামে ব্যবিচার হারাম কাজ। সুতরাং, স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও একথা গ্রহণযোগ্য নয় যে, ইসলাম দাসীদের জোরপূর্বক সহবাসের বৈধতা দেয়। এছাড়াও আমাদের কাছে ইসলামী স্কলারদের ফতোয়া রয়েছে যেখানে তিনারা দাসীদের সাথে জোরপূর্বক সহবাস করাকে হারাম করেছেন।

ইমাম শাফিঈ (রহ) বলেন,

আর যদি সে (স্ত্রী বা দাসী) তার প্রতি অনাগ্রহী হয়, তাহলে সহবাস (الايجاع) কোনো কামলিপ্সা বা আনন্দের বিষয় নয়, এবং কাউকে এতে জোর করা বৈধ নয়। (( কিতাবুল উম্ম; ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইদ্রিস আশ-শাফিঈর (রহ.) ১৫০- ২০৪ হিজরি। তাহকিক ও তাখরিজ:ডক্টর রিফাত ফাওযী আবদুল মুত্তালিব কর্তৃক; ষষ্ঠ খণ্ড পৃষ্ঠা ৪৮২। প্রকাশনী:দার আল-ওয়াফা, ২০০১ ))

ইমাম শাফিঈ (রহ.) এখানে স্পষ্ট করে বলেছেন, যদি দাসী বা স্ত্রী অনাগ্রহী হয়, তবে জোরপূর্বক সহবাস করা বৈধ নয়। ইসলাম পুরুষকে এমন কোনো অধিকার দেয়নি যে সে ইচ্ছামতো জোর করে সম্পর্ক স্থাপন করবে। বরং তাকেও আল্লাহভীতি অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দাস-দাসী প্রসঙ্গে কুরআন ও হাদিসের বক্তব্যগুলোকে সার্বিকভাবে বিবেচনা করে এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহ আবু আব্দুল্লাহ আল হালিমি(র.) [মৃত্যু ৪০৩ হিজরি/১০১২ খ্রিষ্টাব্দ] উল্লেখ করেছেন –

وأَن يُعْتِقُهُ مُتَبَرِّعًا أَحُسْنٌ وَأَجْمَلُ أَن يَلْزَمُهُ بَدَلَا ، وإِذَا اِشْتَرَى رَجُلٌ بِه عَاهَةِ مستقدرَة عَبْدًا لِيَخْدُمُهُ ، فإِنّ كَرِهَ الْعَبْدُ صِحَّتَهُ ، فَلَيَبِيعُهُ وإِن اِشْتَرَى جَارِيَةً فَكَرِهَتْ أَن يُسَمِّهَا أَو يُضَاجِعُهَا ، فلَا يَمَسُّهَا ولَا يُضَاجِعُهَا ولَا يَطَأُهَا إِلَّا بِإِذْنِهَا ، وَبَيْعَهَا إِنّ أَرَادَتْ ذَلِك وَالْإحْسَانُ إِلَى الْمَمْلُوكِ يَجْمَعُ الشُّكْرُ لِلَهَّ تُعَالَى عَلَى الْفِكَاكِ وَالسلَّامَةِ مِن ذُلِّ الرِّقِّ ،  وَالْعَدْلَ وَالْإِنْصَافَ فَيَمَنَ يَضُمُّهُ الْمَلِكُ ، واستطباة نَفْس الْمُلُوكِ ، وَاِسْتِجْلَاَبَ طَاعَتِهِ ومناصحته ، ففِيه نَظَرَ لِلْمَالِكُ دنِيًّا وَدِينًا ، وَنَظَرٌ لِلْمُلُوكَ وَبِذَٰلِكَ جَاءَت الْأَخْبَارُ مُجْمَلَةً وَمُفَصَّلَةً

অর্থঃ “আর কোনো বিনিময়ের আশা না করে স্বেচ্ছায় তাকে [দাসকে] মুক্ত করে দেয়া অধিক উত্তম কাজ। যদি শারিরীক বিকলাঙ্গতা আছে এমন কেউ একজন দাস ক্রয় করে নিজের খেদমতের জন্য, আর সেই দাস তার [মনিবের] স্বাস্থ্যগত বিষয় অপছন্দ করে, তাহলে [তাকে কষ্ট না দিয়ে] সে তাকে বিক্রি করে দেবে। যদি কেউ একজন দাসী ক্রয় করে এবং ঐ দাসী যদি তার [মনিব] কর্তৃক স্পর্শ করা বা তার সাথে শোয়া অপছন্দ করে, তাহলে সে তার [দাসীর] অনুমতি ছাড়া তাকে স্পর্শ করবে না, তার সাথে শোবে না আর তার সাথে সহবাসও করবে না। আর সে [দাসী] যদি চায় তবে তাকে সে বিক্রি করে দেবে। দাসের প্রতি অনুগ্রহ করা মানে আল্লাহ তা’আলার শুকরিয়া আদায় করা, কারণ তিনি [সেই মনিবকে] দাসত্বের অপমান থেকে মুক্তি ও নিরাপত্তা দিয়েছেন। শাসক যার উপর শাসন করেন, তাদের প্রতি ন্যায়বিচার ও ইনসাফ করা, শাসিতদের কল্যাণ কামনা করা, তাদের আনুগত্য নিশ্চিত করা এবং আন্তরিক পরামর্শ প্রদান করা — এসব বিষয় সে শাসকের দুনিয়া ও দ্বীন উভয়ের জন্যই কল্যাণকর। এটি শাসিতদের জন্যও কল্যাণকর। আর তা শাসকদের জন্য নিদর্শনস্বরূপ। এ ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত ও বিষদভাবে বহু বর্ণনা [হাদিস] এসেছে।” (( মিনহাজ ফি শু’আবিল ঈমান – আবু আব্দুল্লাহ আল হালিমি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৬৭। ص267 - كتاب المنهاج في شعب الإيمان - الثامن والخمسون من شعب الإيمان وهو باب في الإحسان إلى المماليك - المكتبة الشاملة ))

ইমাম ইবনু কুদামা মাকদিসি(র.) তাঁর সুবিখ্যাত ‘আল মুগনী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, 

أَنَّ الْغَاصِبَ إذَا وَطِئَ الْجَارِيَةَ الْمَغْصُوبَةَ، فَهُوَ زَانٍ؛ لِأَنَّهَا لَيْسَتْ زَوْجَةً لَهُ وَلَا مِلْكَ يَمِينٍ، فَإِنْ كَانَ عَالِمًا بِالتَّحْرِيمِ، فَعَلَيْهِ حَدُّ الزِّنَى؛ لِأَنَّهُ لَا مِلْكَ لَهُ، وَلَا شُبْهَةَ مِلْكٍ، وَعَلَيْهِ مَهْرُ مِثْلِهَا، سَوَاءٌ كَانَتْ مُكْرَهَةً أَوْ مُطَاوِعَةً.

অর্থঃ “যদি কোনো জোরপূর্বক দখলকারী ব্যক্তি কোনো দাসীর সাথে (জোরপূর্বক) সহবাস করে, তবে সে একজন ব্যভিচারী। কারণ, সে তার স্ত্রী নয় এবং মালিকানাধীনও নয়। যদি সে এই কাজের নিষিদ্ধতা সম্পর্কে জ্ঞাত থাকে, তবে তার উপর ব্যভিচারের নির্ধারিত শাস্তি (হাদ্দ) প্রযোজ্য হবে। কারণ, তার মালিকানা নেই এবং কোনো ধরনের মালিকানার (আইনগত) সন্দেহও নেই। এছাড়া, তাকে ঐ দাসীর উপযুক্ত দেনমোহর (মাহর) প্রদান করতে হবে, তার সাথে বাধ্য হয়েই (সহবাস করা) হোক বা সম্মতিতে হোক।” (( ج5 - ص199 - كتاب المغني لابن قدامة ط مكتبة القاهرة - مسألة غصب جارية فوطئها وأولدها - المكتبة الشاملة অর্কাইভকৃত লিংকঃ ص199 - كتاب المغني لابن قدامة ط مكتبة القاهرة - مسألة غصب جارية فوطئها وأولدها - المكتبة الشاملة ))

ইমাম ইবন হাজার আসকালানী (র.) বলেন,

قَوْلُهُ: (بَابُ لَا يَجُوزُ نِكَاحُ الْمُكْرَهِ) الْمُكْرَهُ بِفَتْحِ الرَّاءِ. قَوْلٌ: ﴿وَلا تُكْرِهُوا فَتَيَاتِكُمْ عَلَى الْبِغَاءِ﴾ ... وَقَدِ اسْتَشْكَلَ بَعْضُهُمْ مُنَاسَبَةَ الْآيَةِ لِلتَّرْجَمَةِ وَجَوَّزَ أَنَّهُ أَشَارَ إِلَى أَنَّهُ يُسْتَفَادُ مَطْلُوبُ التَّرْجَمَةِ بِطَرِيقِ الْأَوْلَى لِأَنَّهُ إِذَا نَهَى عَنِ الْإِكْرَاهِ فِيمَا لَا يَحِلُّ فَالنَّهْيُ عَنِ الْإِكْرَاهِ فِيمَا يَحِلُّ أَوْلَى. অর্থঃ “তাঁর বাণীঃ (অধ্যায়: জবরদস্তি করে বিয়ে বৈধ নয়)— المُكْرَهُ শব্দটি ر (রা) অক্ষরে ফাতহা (যবর) সহ উচ্চারিত হবে। [আল্লাহর] বাণীঃ "আর তোমরা তোমাদের দাসীদেরকে ব্যভিচারে বাধ্য কোরো না..." (সুরা নুর ২৪ : ৩৩) ... ... ... যদি এমন বিষয়ে জবরদস্তি করা নিষিদ্ধ হয় যা হারাম, তবে যে বিষয়ে অনুমতি আছে, সেখানে জবরদস্তি নিষিদ্ধ হওয়া আরও অধিক প্রযোজ্য।” (( ফাতহুল বারী – ইবন হাজার আসকালানী, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ৩১৯। ص319 - كتاب فتح الباري بشرح البخاري ط السلفية - باب إذا أكره حتى وهب عبدا أو باعه لم يجز - المكتبة الشاملة ))

সহবাসের ক্ষেত্রে দাসীর অনুমতি লাগবে কিনা বা দাসীর সাথে জোরাজুরি করার কোনো বিষয় ইসলামে আছে কিনা এ প্রসঙ্গে Islamic Online Madrasah (IOM) এর ইফতা বিভাগে সুনির্দিষ্টভাবে প্রশ্ন করা হলে তাঁরাও অনুরূপ উত্তর প্রদান করেন; 

দাসীদের সাথে সহবাসের ক্ষেত্রে ইসলাম অন্য কিছু ধর্মের ন্যায় জোর করার অনুমতি দেয় না। এক্ষেত্রে ইসলামের বিধান হলো দাসীদের সাথে সহবাস কেবল তাদের সন্তুষ্টি চিত্তেই হবে। জোরপূর্বক নয়। (( ইসলামে ক্রীতদাসী এর সাথে সহবাস কেন বৈধ? - Islamic Fatwa ))

সুতরাং, ইসলামী নীতি কিংবা দলিল কোনোটির আলোকেই একথা গ্রহণযোগ্য নয় যে ইসলাম যুদ্ধবন্দী দাসীদের সাথে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্কের অনুমতি দেয় কিংবা দাসীদের ধর্ষণ করার বৈধতা দেয়। 

ক্রীতদাসকে প্রহার করলে মুক্ত করে দেওয়ার শিক্ষা এবং জোরপূর্বক সহবাসের দাবি

হাদিসে এসেছে,

পরিচ্ছেদঃ ৮. ক্রীতদাসের সাথে সদ্ব্যবহার করা এবং দাসকে চপোটাঘাতের কাফফারা

৪১৬২। আবূ কুরায়ব মুহাম্মদ ইবনুু আ’লা (রহঃ) ... আবূ মাসউদ আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার এক ক্রীতদাসকে প্রহার করছিলাম। হঠাৎ আমার পিছন দিক থেকে একটি আওয়ায শুনলাম, হে আবূ মাসউদ! জেনে রেখো, তুমি তার ওপর যেরূপ ক্ষমতাবান, আল্লাহ তা’আলা অবশ্যই তোমার ওপর এর চেয়ে অধিক ক্ষমতাবান। হঠাৎ পিছন দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সে আল্লাহর ওয়াস্তে আযাদ। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ শোন! যদি তুমি তা না করতে তাহলে অবশ্যই (জাহান্নামের) আগুন তোমাকে ঝলসে দিত। কিংবা (তিনি বললেন) আগুন তোমাকে অবশ্যই-স্পর্শ করতো।

এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ ক্রীতদাসের প্রতি কঠোর আচরণকে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এমনকি একজন দাসকে প্রহার করার পরিণতি সম্পর্কে তিনি এত কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন যে, সাহাবি (রা.) সঙ্গে সঙ্গে তাকে মুক্ত করে দেন এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ এ কাজকে সমর্থন করেন।

এখান থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। যারা দাবি করেন যে ইসলাম দাসীদের সঙ্গে জোরপূর্বক সহবাসের অনুমতি দিয়েছে, তাদের এই দাবিকে ইসলামী উৎসের সামগ্রিক শিক্ষার আলোকে যাচাই করা প্রয়োজন।

জোরপূর্বক সহবাসের বাস্তব অর্থ হলো একজন নারীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে শারীরিকভাবে দমন করা। এমন পরিস্থিতিতে বলপ্রয়োগ, আঘাত বা নির্যাতনের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই জড়িত থাকে। অথচ রাসুলুল্লাহ ﷺ একটি দাসকে প্রহার করার ঘটনাকেই এত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছেন যে, তার পরিণতি হিসেবে জাহান্নামের কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন এবং দাসকে মুক্ত করে দেওয়ার ঘটনাকে সমর্থন করেছেন।

অতএব, এই হাদিস ইসলামের সেই নৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করে যে, ক্রীতদাস বা দাসীর ওপর নির্যাতন ও জুলুম গ্রহণযোগ্য নয়। এ কারণে ইসলামী শরিয়ত দাসীদের সঙ্গে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগমূলক সহবাসকে বৈধ করেছে—এমন দাবি হাদিসের সামগ্রিক শিক্ষা ও ইসলামী নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং এটি ইসলামী উৎসগুলোর একপাক্ষিক ও বিকৃত উপস্থাপনার ফল।

যুদ্ধবন্দী মানেই কি ‘যৌনদাসী’?

অমুসলিম ও নাস্তিকদের একটি প্রচলিত অভিযোগ হলো, মুসলিমরা নাকি যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত কাফির নারীদের বন্দি করে এনে তাদেরকে ‘যৌনদাসী’ বানাত। কিন্তু ইসলামী শরিয়তের বিধান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ কোনো নারী যুদ্ধবন্দী হলেই তার সঙ্গে সহবাস বৈধ হয়ে যায়, ইসলামে এমন কোনো বিধান নেই। বরং একজন যুদ্ধবন্দী নারী দাসী হিসেবে কারও অধীনে আসা এবং এরপর তার ব্যাপারে কোনো বিধান কার্যকর হওয়ার আগে একাধিক আইনগত ধাপ রয়েছে।

যুদ্ধবন্দী হলেই কেউ দাসী হয়ে যায় না

ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাষ্ট্রপ্রধান বা মুসলিমদের আমিরের। তিনি পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। যেমন,

  • নিঃশর্তভাবে মুক্তি দিতে পারেন।

  • মুক্তিপণের বিনিময়ে অথবা বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে ছেড়ে দিতে পারেন।

  • অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি দিতে পারেন।

  • অথবা দাস ও দাসীতে পরিণত করতে পারেন।

এছাড়া কোনো যুদ্ধবন্দীকে কার অধীনে দেওয়া হবে, সেটিও রাষ্ট্রপ্রধানের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। শাসক আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে কোনো যুদ্ধবন্দীকে নিজের দাস বা দাসী হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না।

এখন চিন্তা করুন, যদি ইসলামের উদ্দেশ্যই হতো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নারীদের বন্দি করে তাদেরকে যৌনদাসী বানানো, তাহলে এত দীর্ঘ আইনগত প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হতো না। বরং সরাসরি বলা হতো, "যুদ্ধবন্দী করো, তারপর সহবাস করো।" কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহতে এমন কোনো বিধান নেই।

কুরআন দাস-দাসীদের বিবাহের নির্দেশ দিয়েছে

আল্লাহ তাআলা বলেন,

আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী। (( সূরা আন-নূর (An-Nur) আয়াত ৩২ - বাংলা অনুবাদ, তাফসীর ও তাজউইদ )) 

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা দাস ও দাসীদের বিবাহ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হলো, যদি দাসী বানানোর মূল উদ্দেশ্যই হতো তাদেরকে কেবল যৌন ভোগের বস্তু বানানো, তাহলে আল্লাহ কেন তাদের বিবাহের নির্দেশ দিলেন? এই আয়াত থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ইসলামে "দাসী" মানেই "যৌনদাসী" নয়। দাসীরও একটি সামাজিক ও পারিবারিক জীবন রয়েছে, এবং ইসলাম সেই জীবনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। 

প্রত্যেক দাসীর সঙ্গে সহবাস বৈধ নয়

কুরআনে মুশরিক নারীদের বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একইভাবে ইসলামী ফিকহে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনো দাসী যদি মুশরিক হয়, তাহলে তার সঙ্গে সহবাস বৈধ নয়। এখন যদি যুদ্ধবন্দী নারী মানেই যৌনদাসী হতো, তাহলে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে এই নিষেধাজ্ঞার কোনো অর্থ থাকত না। কিন্তু ইসলামে স্পষ্টভাবে কিছু শ্রেণির নারীর সঙ্গে সহবাস নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটি দেখায় যে, যুদ্ধবন্দী হওয়া মাত্রই কোনো নারী যৌনসম্পর্কের জন্য বৈধ হয়ে যায় না।

মুশরিক দাসীদের সহিত সহবাসে নিষেধাজ্ঞা

আল কুরআনে সুরা বাকারাহর ২২১ নং আয়াতে বলা হয়েছে –

وَ لَا تَنۡكِحُوا الۡمُشۡرِكٰتِ حَتّٰی یُؤۡمِنَّ ؕ

অর্থঃ "আর তোমরা মুশরিক নারীদের 'নিকাহ' করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে...

আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসির কুরতুবীতে বলা হয়েছে—

وَنَكَحَ أَصْلُهُ الْجِمَاعُ، وَيُسْتَعْمَلُ فِي التَّزَوُّجِ تَجَوُّزًا وَاتِّسَاعًا،

অর্থঃ “এবং "نَكَحَ" (নাকাহা) কথাটির মূল অর্থ হলো "সঙ্গম করা," তবে এটি রূপক অর্থে এবং ব্যাপক অর্থে "বিবাহ করা" অর্থেও ব্যবহার করা হয়।” (( তাফসির কুরতুবী, সুরা বাকারাহর ২২১ নং আয়াতের তাফসির, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৬৭ https://shamela.ws/book/20855/975 অথবা https://archive.is/wip/dpoDD (আর্কাইভকৃত) ))

ইমাম ইবনু কুদামা মাকদিসি(র.) তাঁর সুবিখ্যাত ‘আল মুগনি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন--

أَنَّ مَنْ حُرِّمَ نِكَاحُ حَرَائِرِهِمْ مِنْ الْمَجُوسِيَّات، وَسَائِرِ الْكَوَافِرِ سِوَى أَهْلِ الْكِتَابِ، لَا يُبَاحُ وَطْءُ الْإِمَاءِ مِنْهُنَّ بِمِلْكِ الْيَمِينِ. فِي قَوْل أَكْثَرِ أَهْلِ الْعِلْمِ، مِنْهُمْ؛ مُرَّةُ الْهَمْدَانِيُّ، وَالزُّهْرِيُّ، وَسَعِيدُ بْنُ جُبَيْرٍ، وَالْأَوْزَاعِيُّ، وَالثَّوْرِيُّ، وَأَبُو حَنِيفَةَ، وَمَالِكٌ، وَالشَّافِعِيُّ. وَقَالَ ابْنُ عَبْدِ الْبَرِّ: عَلَى هَذَا جَمَاعَةُ فُقَهَاءِ الْأَمْصَارِ، وَجُمْهُورُ الْعُلَمَاءِ، وَمَا خَالَفَهُ فَشُذُوذٌ لَا يُعَدُّ خِلَافًا.

অর্থঃ “যে সকল স্বাধীন নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম করা হয়েছে, যাদের মধ্যে আছে আহলে কিতাব ব্যতিত মাজুসী (Zoroastrians/অগ্নিপূজকদের) এবং অন্য সকল কাফির নারী। তাদের ক্ষেত্রে মালিকানার অধিকারেও দাসীদের সাথে সহবাস জায়েজ নয়। এটাই অধিকাংশ আলিমের বক্তব্য। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মুররাহ আল-হামদানি(র.), যুহরি(র.), সাঈদ বিন জুবাইর(র.), আওযায়ী(র.), সাওরি(র.), আবু হানিফা(র.), মালিক(র.) এবং শাফিঈ(র.)। ইবন আব্দুল বার(র.) বলেছেন: "এটাই বিভিন্ন অঞ্চলের ফকিহদের মত এবং অধিকাংশ আলিমের অভিমত। এর বিপরীত যে মত আছে, তা শুযুয (বিচ্ছিন্ন মত) এর অন্তর্ভুক্ত এবং সেটিকে কোনো মতপার্থক্য হিসেবেও গণ্য করা হয় না। (( আল মুগনি – ইবনু কুদামা মাকদিসি, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৩৪ https://shamela.ws/book/8463/2944 অথবা https://archive.is/wip/NCirL (আর্কাইভকৃত) ))

ইসলাম দাস-দাসীদের মুক্তির পথ উন্মুক্ত করেছে

হাদিসে এসেছে,

পরিচ্ছেদঃ ৫০/১. মুকাতাব বা চুক্তির ভিত্তিতে অর্থের কিস্তি প্রসঙ্গে। প্রতি বছর এক কিস্তি করে আদায় করা। 

আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ ‘‘তোমাদের এবং তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীদের মধ্যে কেউ তার মুক্তির জন্য চুক্তিপত্র লিখতে চাইলে তাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হও, যদি তোমরা ওদের মধ্যে মঙ্গলের সন্ধান পাও এবং আল্লাহ তোমাদের যে সম্পদ দিয়েছেন, তা হতে তোমরা ওদের দান করবে’’- (আন-নূর ৩২)।

রাওয়াহ (রহ.) বলেন, ইবনু জুরাইজ (রহ.) বর্ণনা করেন, আমি ‘আতা (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, যদি আমি জানতে পারি যে, তার (গোলামের) অর্থ-সম্পদ রয়েছে, তবে কি তার সাথে কিতাবের চুক্তি করা আমার জন্য ওয়াজিব হবে? তিনি বললেন, আমি তো ওয়াজিব ছাড়া অন্য কিছু মনে করি না। ‘আমর ইবনু দ্বীনার (রহ.) বলেন, আমি ‘আতা (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, এ মতামত কি আপনি (পূর্ববর্তী) কারো কাছ হতে বর্ণনা করছেন? তিনি বললেন, না। তারপর ‘আতা (রহ.) আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, মূসা ইবনু আনাস (রহ.) তাকে অবহিত করেছেন যে, আনাস (রাঃ)-এর কাছে তার ক্রীতদাস সীরীন মুকাতাব (চুক্তিবদ্ধ) হবার আবেদন জানাল। সে বিত্তশালী ছিল। কিন্তু আনাস (রাঃ) তাতে অস্বীকৃতি জানালেন। সীরীন তখন ‘উমার (রাঃ)-এর কাছে বিষয়টি উত্থাপন করল। ‘উমার (রাঃ) তখন তাকে [আনাস (রাঃ)-কে] বেত্রাঘাত করলেন এবং নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করলেন, ‘‘তোমরা তাদের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হও, যদি তোমরা তাদের মধ্যে মঙ্গলের সন্ধান পাও’’- (আন-নূর ৩৩)।


২৫৬০. ‘আয়িশাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, বারীরা (রাঃ) একবার মুকাতাবাতের সাহায্য চাইতে তাঁর কাছে আসলেন। প্রতিবছর এক ‘উকিয়া’ করে পাঁচ বছরে পাঁচ ‘উকিয়া’ তাকে পরিশোধ করতে হবে। তার প্রতি ‘আয়িশাহ (রাযি.) আগ্রহান্বিত হলেন। তাই তিনি বললেন, যদি আমি এককালীন মূল্য পরিশোধ করে দেই তবে কি তোমার মালিক তোমাকে বিক্রি করবে? তখন আমি তোমাকে মুক্ত করে দিব এবং তোমার ওয়ালার অধিকার আমার হবে। বারীরা (রাঃ) তার মালিকের কাছে গিয়ে উক্ত প্রস্তাব পেশ করলেন। কিন্তু তারা বলল, না; তবে যদি ওয়ালার অধিকার আমাদের হয়। ‘আয়িশাহ (রাযি.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর খিদমতে গেলাম এবং বিষয়টি তাঁকে বললাম। (রাবী বলেন) তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, তাকে খরিদ করে মুক্ত করে দাও। কেননা, ওয়ালা তারই হবে, যে মুক্ত করবে। তারপর তিনি দাঁড়িয়ে বললেন, মানুষের কী হল, তারা এমন সব শর্তারোপ করে, যা আল্লাহর কিতাবে নেই! আল্লাহর কিতাবে নেই এমন শর্ত কেউ আরোপ করলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। আল্লাহর দেয়া শর্তই সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য। (৪৫৬) (আধুনিক প্রকাশনীঃ কিতাবুল মুকাতাব অনুচ্ছেদ-১, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ  অনুচ্ছেদ ১৬০২) (( সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) | হাদিস: ২৫৬০ | Sahih al-Bukhari, Hadith No. 2560 )) 

কুরআন ও হাদিসে স্পষ্ট দেখা যায়, কোনো দাস বা দাসী যদি মুক্তি লাভ করতে চায় এবং মুকাতাব চুক্তির উপযুক্ত হয়, তাহলে তার জন্য মুক্তির ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, যদি ইসলামের উদ্দেশ্যই হতো যুদ্ধবন্দী নারীদের আজীবন যৌনদাসী হিসেবে রেখে দেওয়া, তাহলে তাদের মুক্তির জন্য এত সুস্পষ্ট আইন ও ব্যবস্থা কেন প্রণয়ন করা হলো? এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামের লক্ষ্য দাসপ্রথাকে স্থায়ী করা নয়; বরং ধীরে ধীরে দাস-দাসীদের মুক্তির বিভিন্ন পথ উন্মুক্ত করা।

উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, "যুদ্ধবন্দী" এবং "যৌনদাসী" এক জিনিস নয়। ইসলামী শরিয়তে যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে রাষ্ট্রপ্রধানের সিদ্ধান্ত, দাসত্বে পরিণত হওয়ার আইনগত প্রক্রিয়া, দাস-দাসীদের বিবাহের নির্দেশ, মুক্তির ব্যবস্থা এবং সহবাসের ক্ষেত্রে বিভিন্ন শর্ত ও বিধিনিষেধ সব মিলিয়ে প্রমাণ করে যে, "যুদ্ধবন্দী মানেই যৌনদাসী" এই প্রচলিত অভিযোগটি ইসলামী আইনের সঠিক প্রতিফলন নয়।

অনেক স্কলার কেন এমন ফতোয়া দিয়েছেন যে দাসীদের সাথে সহবাসে জোর জবরদস্তি করা যাবে?

বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন শায়খ আহমাদুল্লাহ (হাফি.) বৈধ দাসী কিংবা স্ত্রীর সাথে সহবাসের ক্ষেত্রে অনুমতি নেয়া জরুরী কিনা এ প্রসঙ্গে কী উত্তর দিয়েছেন তা দেখে নিন।

দাসীদের ক্ষেত্রে সহবাসের বিষয়ে যেসব স্কলার “জোর” বা “জবরদস্তি” শব্দ ব্যবহার করেছেন, তাদের বক্তব্যকে বুঝতে হলে এর প্রকৃত অর্থ ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি। এখানে “জোর” বলতে এমন কোনো জুলুম, নির্যাতন বা শারীরিক বাধ্যবাধকতা বোঝানো হয়নি, যার মাধ্যমে কারো ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে কষ্ট দেওয়া হবে। বরং এটি এমন এক ধরনের আবদারমূলক জোর, যা পারস্পরিক সম্পর্ক, ঘনিষ্ঠতা এবং বোঝাপড়ার ভিত্তিতে হয়ে থাকে।

যেমন, ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীর নিকট বৈধ অধিকার দাবি করতে পারেন, আবার স্ত্রীও স্বামীর নিকট তার অধিকার দাবি করতে পারেন। কিন্তু এই অধিকার প্রয়োগের অর্থ কখনোই স্ত্রীকে আঘাত করা, অপমান করা বা তার উপর জুলুম করা নয়। বরং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক যেহেতু ভালোবাসা, দয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত, তাই সেখানে কোনো বিষয়ে আবদার করা বা একে অপরের কাছে প্রত্যাশা প্রকাশ করার সুযোগ থাকে।

একইভাবে, ঐতিহাসিক দাসপ্রথার প্রেক্ষাপটে মনিব ও দাসীর সম্পর্ককে কেবল শত্রুতা বা নিপীড়নের সম্পর্ক হিসেবে দেখা হয়নি। ইসলামী বিধানের আলোচনায় দাসীর ভরণ-পোষণ, নিরাপত্তা ও মানবিক আচরণের দায়িত্ব মনিবের উপর আরোপ করা হয়েছে। ফলে এই সম্পর্কের মধ্যেও দায়িত্ব ও পারস্পরিক আচরণের একটি কাঠামো ছিল।

তবে এখানেও “জোর” শব্দটি কোনোভাবেই দাসীর উপর নির্যাতন, জবরদস্তি বা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর আচরণকে বৈধতা দেয় না। কোনো ধরনের জুলুম বা ক্ষতি করা ইসলামী নীতির পরিপন্থী। ইতোমধ্যে আমরা একাধিক স্কলার থেকে রেফারেন্স দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করেছি। যেসব স্কলার এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন, তাদের বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল সম্পর্কের ভেতরে অধিকার ও প্রত্যাশার বিষয়টি ব্যাখ্যা করা, নির্যাতন বা অন্যায় আচরণকে অনুমোদন দেওয়া নয়।

অতএব, দাসীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত “জোর” শব্দকে তার ঐতিহাসিক ও পারিভাষিক অর্থে বুঝতে হবে। এটিকে আধুনিক অর্থে সহিংস জবরদস্তি বা নিপীড়ন হিসেবে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয়।

Leave a Comment