ইসলাম কি যুদ্ধবন্দী নারী কিংবা দাসীদের ধর্ষণ করার অনুমতি দেয়?

ইসলাম কি যুদ্ধবন্দী নারী কিংবা দাসীদের ধর্ষণ করার অনুমতি দেয়?

ইসলাম কি যুদ্ধবন্দী নারী কিংবা দাসীদের ধর্ষণ করার অনুমতি দেয়?

সংক্ষিপ্ত উত্তর: না। ইসলামী শরিয়তে যুদ্ধবন্দী হওয়া মাত্রই কোনো নারী দাসী হয়ে যায় না বা তার সঙ্গে সহবাস বৈধ হয়ে যায় না। যুদ্ধবন্দীদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপ্রধান গ্রহণ করেন। তিনি মুক্তি, মুক্তিপণ, বন্দি বিনিময়, শাস্তি বা দাসত্বসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাছাড়া ইসলামী শরিয়তে প্রত্যেক দাসীর সঙ্গে সহবাস বৈধ নয়; এ বিষয়ে কুরআন ও ফিকহে একাধিক শর্ত ও বিধিনিষেধ রয়েছে। বিভিন্ন ফকীহ সহবাসের ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগকে বৈধ বলেননি এবং কুরআন ও হাদিসে দাস-দাসীদের বিবাহ ও মুক্তির পথও উন্মুক্ত করা হয়েছে। তাই "ইসলাম যুদ্ধবন্দী নারী কিংবা দাসীদের ধর্ষণের অনুমতি দেয়" অথবা "যুদ্ধবন্দী মানেই যৌনদাসী" এমন দাবি ইসলামী শরিয়তের সামগ্রিক বিধান ও আলোচনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আধুনিক সময়ে অমুসলিমরা ইসলাম নিয়ে নানা বিভ্রান্তিকর ও ভূল দাবি প্রচার করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ইসলাম ও দাস প্রথা নিয়ে তাদের মনগড়া ব্যাখ্যা, যেখানে তারা দাবি করে যে, ইসলাম যুন্ধবন্দী নারী কিংবা দাসীদের ধর্ষণ করার অনুমতি দেয়। তারা ইসলামের মূল নীতিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে, যাতে পাঠক বা দর্শকরা ইসলামকে নৈতিকভাবে অবমানিত মনে করে। এই লিখায় আমি অমুসলিমদের এ ধরনের অভিযোগ এবং দাসীর সঙ্গে সহবাস সম্পর্কিত তাদের ভুল ধারণা বিস্তারিত তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। 

অভিযোগের উৎস

ইসলামে দাস-দাসী বলতে মূলত যুদ্ধবন্দীদের বোঝানো হয়। এই বিষয়ে আশা করি সকলের ধারণা আছে। যাঁরা মুসলিমদের সঙ্গে সংঘর্ষে পরাজিত হয়ে বন্দী হন, তাদের প্রতি মুসলিমদের করণীয় কী, তাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে, তাদের অধিকার কী, এসব বিষয়ে ইসলামে সুস্পষ্ট বিধান প্রদান করা আছে। নিয়মানুযায়ী যুদ্ধবন্দীদের মর্যাদা রক্ষা, সম্মান প্রদর্শন এবং ন্যায়সঙ্গত আচরণ নিশ্চিত করা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার অংশ। তেমনি একটি বিধান হলো যুদ্ধবন্দী নারীদের সাথে ইসলাম সহবাস করাকে হালাল করেছেন। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন; 

নারীদের মধ্যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ নারীগণও তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ, কিন্তু তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীদের বাদে, আল্লাহ এসব ব্যবস্থা তোমাদের উপর ফরয করে দিয়েছেন। তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ নারীদের ছাড়া অন্যান্য সকল নারীদেরকে মোহরের অর্থের বদলে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে চাওয়া তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে, অবৈধ যৌন সম্পর্কের জন্য নয়। অতঃপর তাদের মধ্যে যাদের তোমরা সম্ভোগ করেছ, তাদেরকে তাদের ধার্যকৃত মোহর প্রদান কর। তোমাদের প্রতি কোনও গুনাহ নেই মোহর ধার্যের পরও তোমরা উভয়ের সম্মতির ভিত্তিতে মোহরের পরিমাণে হেরফের করলে, নিশ্চয় আল্লাহ সবিশেষ পরিজ্ঞাত ও পরম কুশলী। (( (4:24) An-Nisa | (৪:২৪) আন-নিসা-অনুবাদ/তাফসীর ))

হাদিসে এসেছে;

পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা ১৮৯৮-[১১]

আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেক ’তাসবীহ’ অর্থাৎ সুবহা-নাল্ল-হ বলা সদাক্বাহ্ (সাদাকা), প্রত্যেক ’তাকবীর’ অর্থাৎ আল্ল-হু আকবার বলা সদাক্বাহ্ (সাদাকা), প্রত্যেক ’তাহমীদ’ বা আলহাম্‌দুলিল্লা-হ বলা সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। প্রত্যেক ’তাহলীল’ বা ’লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’ বলা সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। নেককাজের নির্দেশ দেয়া, খারাপ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখা সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। নিজের স্ত্রী অথবা দাসীর সাথে সহবাস করাও সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। সাহাবীগণ আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ যদি নিজের কামভাব চরিতার্থ করে তাতেও কি সে সাওয়াব পাবে? উত্তরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমাকে বলো, কোন ব্যক্তি যদি হারাম উপায়ে কামভাব চরিতার্থ করে তাহলে সেকি গুনাহগার হবে না? ঠিক এভাবেই হালাল উপায়ে (স্ত্রী অথবা দাসীর সাথে) কামভাব চরিতার্থকারী সাওয়াব পাবে।

(মুসলিম)[1] [1] সহীহ : মুসলিম ১০০৬, আহমাদ ২১৪৮২, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৭৮২৩, সিলসিলাহ্ আস্ সহীহাহ্ ৪৫৪, সহীহ আত্ তারগীব ১৫৫৬, সহীহ আল জামি‘ আস্ সগীর ২৫৮৮। (( মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) | হাদিস: ১৮৯৮ | Mishkat al-Masabih, Hadith No. 1898 ))

কুরআন এবং হাদিসে উল্লেখিত রয়েছে, যুদ্ধবন্দী দাসীদের সাথে সহবাস করা বৈধ। তাই নাস্তিকদের অভিযোগ ইসলাম নাকি যুদ্ধবন্দীদের ধর্ষনের অনুমতি বা ধর্ষণের বৈধতা দেয়।

ইসলাম কী আসলে যুন্ধবন্দীদের সাথে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্কের বৈধতা দেয়?

পাঠক, আপনারা যদি কুরআনের আয়াত ও হাদীসসমূহ একত্রে পর্যালোচনা করেন, তাহলে সর্বত্রই দেখতে পাবেন ইসলামে যুদ্ধবন্দী বা দাসীদের সঙ্গে সহবাসকে বৈধ, জায়েয ও হালাল বলা হয়েছে। কিন্তু অন্ধবিশ্বাসী নাস্তিকদের দাবি কী? তাদের দাবি হলো ইসলাম নাকি দাসীদের ধর্ষণের অনুমতি দিয়েছে! ভালো করে লক্ষ্য করুন, কুরআন ও হাদীসে স্পষ্ট বলা হয়েছে “সহবাস বৈধ”, কিন্তু নাস্তিকরা সেটাকেই বিকৃত করে “জোরপূর্বক ধর্ষণ” বলে প্রচার করছে। কত বড় মিথ্যাচার এটি! কোনো কিছু বৈধ হওয়ার মানে কি তা জোর করে করতে হবে? ইসলামে নারী ও পুরুষের জন্য ১৪ জন আত্মীয় ব্যতীত অন্য সবার সঙ্গে বিবাহ বৈধ। কিন্তু তার মানে কি একজন পুরুষ দুনিয়ার সব নন-মাহরাম নারীকে জোরপূর্বক বিবাহ করতে পারেন? কখনোই না। মাছ খাওয়া হালাল। কিন্তু এর মানে এই নয় যে সবাইকে মাছ খেতেই হবে। ইচ্ছা করলে খাওয়া যায়, না চাইলে নয়। আবার ইচ্ছে হলেও আপনি জোরপূর্কব অন্যের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে খেতে পারবেন না, কিংবা চুরি করে খেতে পারবেন না। আপনাকে বৈধ উপায়েই খেতে হবে। একইভাবে, দাসীর সঙ্গে সহবাস ইসলামে বৈধ বা হালাল বিষয়। এর মানে এই নয় যে তা জোরপূর্বক হতে হবে। বরং, এটি নির্দিষ্ট নৈতিক ও আইনি কাঠামোর ভেতরে, সম্মতির ভিত্তিতে বৈধ। নাস্তিকদের দাবী ইসলাম দাসীদের ধর্ষনের বৈধতা দেয়। তাই আমাদের শুরুতে ইসলামে ধর্ষণ কাকে বলে সেটা জেনে নেওয়া দরকার।

ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় ‘ধর্ষণ’ কাকে বলে?

‘ধর্ষণ’ প্রসঙ্গে অভিধানে বলা হয়েছে,

وَفِي لِسَان الْعَرَب: وَقد تَكَرَّر ذِكْرُ الغصْب فِي الحَدِيث، وَهُوَ أَخْذُ مَالِ الغَيْرِ ظُلْماً وعُدُواناً. وَفِي الحَدِيثِ (أَنَّه غصَبَها نَفْسَها) أَرادَ أَنَّه وَاقَعها كُرْها فاسْتَعَارَه لِلْجِمَاع. অর্থঃ "লিসানুল আরব"-এ বলা হয়েছে, হাদিসে "غَصْب" (জবরদখল বা বলপ্রয়োগ) বারবার এসেছে, এবং এটি অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ও জোরপূর্বক গ্রহণ করাকে বোঝায়। একটি হাদিসে এসেছে: "أنه غصَبَها نَفْسَها" এর অর্থ হলো, “সে তার সাথে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সহবাস করেছিল (বা ধর্ষণ করেছিল)” ; এবং এখানে সহবাস বোঝাতে শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। (( তাজুল ‘আরুস মিন জাওয়াহিরিল ক্বামুস – মুর্তাযা আয-যাবিদি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৮৪।(( ص484 - كتاب تاج العروس من جواهر القاموس - غشرب - المكتبة الشاملة  )) 

ইসলামী শরিয়তে ধর্ষণকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় – “একজন পুরুষের দ্বারা একজন নারীর সাথে জোরপূর্বক অবৈধ যৌন সঙ্গম, যেখানে নারী তার সাথে বৈধভাবে বিবাহিত নয় এবং তার স্বাধীন ইচ্ছা ও সম্মতি ছাড়াই এটি সংঘটিত হয়।”  (( "Forcible illegal sexual intercourse by a man with a woman who is not legally married to him, without her free will and consent"- Azman Mohd Noor (1 January 2010). "Rape: A Problem of Crime Classification in Islamic Law". Arab Law Quarterly, Vol. 24, No. 4 (2010), pp. 417-438. Rape: A Problem of Crime Classification in Islamic Law in: Arab Law Quarterly Volume 24 Issue 4 (2010) )) ইসলামী দণ্ডবিধিতে ধর্ষণকে জবরদস্তিমূলক ব্যাভিচারের আওতায় ফেলা হয়। (( দেখুনঃ মুয়াত্তা মালিক,  বিচার সম্পর্কিত অধ্যায় (كتاب الأقضية); بَاب الْقَضَاءِ فِي الْمُسْتَكْرَهَةِ مِنْ النِّسَاءِ (পরিচ্ছেদঃ ১৬. কোন স্ত্রীলোকের সাথে জবরদস্তি যিনা করিলে তাহার ফয়সালা) মুয়াত্তা মালিক | হাদিস: ১৪৩৫ | Muwatta Imam Malik, Hadith No. 1435 ))

সহবাসের ক্ষেত্রে দাসীর মতামত

নাস্তিকরা যে বলে ইসলামে দাসীদের সাথে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক করা জায়েজ। কিন্তু জোরপূর্বক সহবাস করা তো ইসলামে ধর্ষণ বা ব্যবিচার হিসবে বিবেচিত হয়। আর ইসলামে ব্যবিচার হারাম কাজ। সুতরাং, স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও একথা গ্রহণযোগ্য নয় যে, ইসলাম দাসীদের জোরপূর্বক সহবাসের বৈধতা দেয়। এছাড়াও আমাদের কাছে ইসলামী স্কলারদের ফতোয়া রয়েছে যেখানে তিনারা দাসীদের সাথে জোরপূর্বক সহবাস করাকে হারাম করেছেন।

ইমাম শাফিঈ (রহ) বলেন,

"তিনি (ইমাম শাফিঈ) বলেন: স্ত্রী যদি এককভাবে একাই থাকে (তার অন্য কোনো সতীন না থাকে), অথবা এমন দাসী থাকে যার সাথে স্বামী সহবাস করে; তবে তাকে (স্বামী/মনিবকে) আল্লাহ তাআলাকে ভয় করার আদেশ দেওয়া হবে, এবং সে যেন সহবাসের ক্ষেত্রে তার (স্ত্রী/দাসীর) কোনো ক্ষতি না করে। ... আর সহবাস হলো তৃপ্তি বা উপভোগের বিষয়, এতে কাউকেই (কোনো পক্ষকেই) বাধ্য বা জোর করা যাবে না। (( কিতাবুল উম্ম; ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইদ্রিস আশ-শাফিঈর (রহ.) ১৫০- ২০৪ হিজরি। তাহকিক ও তাখরিজ:ডক্টর রিফাত ফাওযী আবদুল মুত্তালিব কর্তৃক; ষষ্ঠ খণ্ড পৃষ্ঠা ৪৮২। প্রকাশনী:দার আল-ওয়াফা, ২০০১ ))

ইমাম শাফিঈ (রহ.) এখানে স্পষ্ট করে বলেছেন, যদি দাসী বা স্ত্রী অনাগ্রহী হয়, তবে জোরপূর্বক সহবাস করা বৈধ নয়। ইসলাম পুরুষকে এমন কোনো অধিকার দেয়নি যে সে ইচ্ছামতো জোর করে সম্পর্ক স্থাপন করবে। বরং তাকেও আল্লাহভীতি অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দাস-দাসী প্রসঙ্গে কুরআন ও হাদিসের বক্তব্যগুলোকে সার্বিকভাবে বিবেচনা করে এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহ আবু আব্দুল্লাহ আল হালিমি(র.) [মৃত্যু ৪০৩ হিজরি/১০১২ খ্রিষ্টাব্দ] উল্লেখ করেছেন –

وأَن يُعْتِقُهُ مُتَبَرِّعًا أَحُسْنٌ وَأَجْمَلُ أَن يَلْزَمُهُ بَدَلَا ، وإِذَا اِشْتَرَى رَجُلٌ بِه عَاهَةِ مستقدرَة عَبْدًا لِيَخْدُمُهُ ، فإِنّ كَرِهَ الْعَبْدُ صِحَّتَهُ ، فَلَيَبِيعُهُ وإِن اِشْتَرَى جَارِيَةً فَكَرِهَتْ أَن يُسَمِّهَا أَو يُضَاجِعُهَا ، فلَا يَمَسُّهَا ولَا يُضَاجِعُهَا ولَا يَطَأُهَا إِلَّا بِإِذْنِهَا ، وَبَيْعَهَا إِنّ أَرَادَتْ ذَلِك وَالْإحْسَانُ إِلَى الْمَمْلُوكِ يَجْمَعُ الشُّكْرُ لِلَهَّ تُعَالَى عَلَى الْفِكَاكِ وَالسلَّامَةِ مِن ذُلِّ الرِّقِّ ،  وَالْعَدْلَ وَالْإِنْصَافَ فَيَمَنَ يَضُمُّهُ الْمَلِكُ ، واستطباة نَفْس الْمُلُوكِ ، وَاِسْتِجْلَاَبَ طَاعَتِهِ ومناصحته ، ففِيه نَظَرَ لِلْمَالِكُ دنِيًّا وَدِينًا ، وَنَظَرٌ لِلْمُلُوكَ وَبِذَٰلِكَ جَاءَت الْأَخْبَارُ مُجْمَلَةً وَمُفَصَّلَةً

অর্থঃ “আর কোনো বিনিময়ের আশা না করে স্বেচ্ছায় তাকে [দাসকে] মুক্ত করে দেয়া অধিক উত্তম কাজ। যদি শারিরীক বিকলাঙ্গতা আছে এমন কেউ একজন দাস ক্রয় করে নিজের খেদমতের জন্য, আর সেই দাস তার [মনিবের] স্বাস্থ্যগত বিষয় অপছন্দ করে, তাহলে [তাকে কষ্ট না দিয়ে] সে তাকে বিক্রি করে দেবে। যদি কেউ একজন দাসী ক্রয় করে এবং ঐ দাসী যদি তার [মনিব] কর্তৃক স্পর্শ করা বা তার সাথে শোয়া অপছন্দ করে, তাহলে সে তার [দাসীর] অনুমতি ছাড়া তাকে স্পর্শ করবে না, তার সাথে শোবে না আর তার সাথে সহবাসও করবে না। আর সে [দাসী] যদি চায় তবে তাকে সে বিক্রি করে দেবে। দাসের প্রতি অনুগ্রহ করা মানে আল্লাহ তা’আলার শুকরিয়া আদায় করা, কারণ তিনি [সেই মনিবকে] দাসত্বের অপমান থেকে মুক্তি ও নিরাপত্তা দিয়েছেন। শাসক যার উপর শাসন করেন, তাদের প্রতি ন্যায়বিচার ও ইনসাফ করা, শাসিতদের কল্যাণ কামনা করা, তাদের আনুগত্য নিশ্চিত করা এবং আন্তরিক পরামর্শ প্রদান করা — এসব বিষয় সে শাসকের দুনিয়া ও দ্বীন উভয়ের জন্যই কল্যাণকর। এটি শাসিতদের জন্যও কল্যাণকর। আর তা শাসকদের জন্য নিদর্শনস্বরূপ। এ ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত ও বিষদভাবে বহু বর্ণনা [হাদিস] এসেছে।” (( মিনহাজ ফি শু’আবিল ঈমান – আবু আব্দুল্লাহ আল হালিমি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৬৭। ص267 - كتاب المنهاج في شعب الإيمان - الثامن والخمسون من شعب الإيمان وهو باب في الإحسان إلى المماليك - المكتبة الشاملة ))

সহবাসের ক্ষেত্রে দাসীর অনুমতি লাগবে কিনা বা দাসীর সাথে জোরাজুরি করার কোনো বিষয় ইসলামে আছে কিনা এ প্রসঙ্গে Islamic Online Madrasah (IOM) এর ইফতা বিভাগে সুনির্দিষ্টভাবে প্রশ্ন করা হলে তাঁরাও অনুরূপ উত্তর প্রদান করেন; 

দাসীদের সাথে সহবাসের ক্ষেত্রে ইসলাম অন্য কিছু ধর্মের ন্যায় জোর করার অনুমতি দেয় না। এক্ষেত্রে ইসলামের বিধান হলো দাসীদের সাথে সহবাস কেবল তাদের সন্তুষ্টি চিত্তেই হবে। জোরপূর্বক নয়। (( ইসলামে ক্রীতদাসী এর সাথে সহবাস কেন বৈধ? - Islamic Fatwa ))

ইমাম ইবন হাজার আসকালানী (র.) বলেন,

قَوْلُهُ: (بَابُ لَا يَجُوزُ نِكَاحُ الْمُكْرَهِ) الْمُكْرَهُ بِفَتْحِ الرَّاءِ. قَوْلٌ: ﴿وَلا تُكْرِهُوا فَتَيَاتِكُمْ عَلَى الْبِغَاءِ﴾ ... وَقَدِ اسْتَشْكَلَ بَعْضُهُمْ مُنَاسَبَةَ الْآيَةِ لِلتَّرْجَمَةِ وَجَوَّزَ أَنَّهُ أَشَارَ إِلَى أَنَّهُ يُسْتَفَادُ مَطْلُوبُ التَّرْجَمَةِ بِطَرِيقِ الْأَوْلَى لِأَنَّهُ إِذَا نَهَى عَنِ الْإِكْرَاهِ فِيمَا لَا يَحِلُّ فَالنَّهْيُ عَنِ الْإِكْرَاهِ فِيمَا يَحِلُّ أَوْلَى. অর্থঃ “তাঁর বাণীঃ (অধ্যায়: জবরদস্তি করে বিয়ে বৈধ নয়)— المُكْرَهُ শব্দটি ر (রা) অক্ষরে ফাতহা (যবর) সহ উচ্চারিত হবে। [আল্লাহর] বাণীঃ "আর তোমরা তোমাদের দাসীদেরকে ব্যভিচারে বাধ্য কোরো না..." (সুরা নুর ২৪ : ৩৩) ... ... ... যদি এমন বিষয়ে জবরদস্তি করা নিষিদ্ধ হয় যা হারাম, তবে যে বিষয়ে অনুমতি আছে, সেখানে জবরদস্তি নিষিদ্ধ হওয়া আরও অধিক প্রযোজ্য।” (( ফাতহুল বারী – ইবন হাজার আসকালানী, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ৩১৯। ص319 - كتاب فتح الباري بشرح البخاري ط السلفية - باب إذا أكره حتى وهب عبدا أو باعه لم يجز - المكتبة الشاملة ))

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া প্রয়োজন। ইবন হাজার আসকালানি এই বক্তব্যে সরাসরি মনিব ও দাসীর মধ্যকার সহবাসের বিধান আলোচনা করেননি। তাঁর তাৎক্ষণিক আলোচনার বিষয় ছিল জোরপূর্বক বিবাহ। তবে সেই প্রসঙ্গে তিনি জবরদস্তি সম্পর্কে একটি সাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ নীতি উল্লেখ করেছেন। সেটি হলো, যে কাজে জবরদস্তি করা হারাম, সেখানে জবরদস্তি নিষিদ্ধ হলে মূলত বৈধ কোনো কাজেও জবরদস্তি নিষিদ্ধ হওয়া আরও বেশি প্রযোজ্য। ফিকহি পরিভাষায় এ ধরনের যুক্তিকে ‘কিয়াসে আওলা’ বলা হয়।

অতএব, আমরা ইবন হাজারের বক্তব্যটিকে দাসীর সঙ্গে জোরপূর্বক সহবাস নিষিদ্ধ হওয়ার সরাসরি ও স্বতন্ত্র ফতোয়া হিসেবে উপস্থাপন করছি না। বরং ইমাম শাফিঈর “সহবাস আনন্দের বিষয় এবং এতে কাউকে বাধ্য করা হবে না” এবং ইমাম হালিমির “দাসীর অনুমতি ছাড়া তার সঙ্গে সহবাস করবে না” বক্তব্যের আলোকে এটিকে একটি সহায়ক মূলনীতি হিসেবে উল্লেখ করছি। কারণ কোনো কাজ মূলত বৈধ হওয়া মানেই সেই কাজ জবরদস্তির মাধ্যমে সম্পন্ন করাও বৈধ হয়ে যায় না। দাসীর সঙ্গে সহবাস নির্দিষ্ট শর্তে বৈধ হলেও, শুধু সেই বৈধতা থেকে তার ওপর জোর প্রয়োগ করার বৈধতা প্রমাণিত হয় না।

সুতরাং, ইসলামী নীতি কিংবা দলিল কোনোটির আলোকেই একথা গ্রহণযোগ্য নয় যে ইসলাম যুদ্ধবন্দী দাসীদের সাথে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্কের অনুমতি দেয় কিংবা বৈধতা দেয়। 

ক্রীতদাসকে প্রহার করলে মুক্ত করে দেওয়ার শিক্ষা এবং জোরপূর্বক সহবাসের দাবি

সহীহ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: ক্রীতদাসের সাথে সদ্ব্যবহার করা এবং দাসকে চপেটাঘাতের কাফফারা এ একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস বর্ণিত হয়েছে।

পরিচ্ছেদঃ ৮. ক্রীতদাসের সাথে সদ্ব্যবহার করা এবং দাসকে চপোটাঘাতের কাফফারা

৪১৬২। আবূ কুরায়ব মুহাম্মদ ইবনুু আ’লা (রহঃ) ... আবূ মাসউদ আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার এক ক্রীতদাসকে প্রহার করছিলাম। হঠাৎ আমার পিছন দিক থেকে একটি আওয়ায শুনলাম, হে আবূ মাসউদ! জেনে রেখো, তুমি তার ওপর যেরূপ ক্ষমতাবান, আল্লাহ তা’আলা অবশ্যই তোমার ওপর এর চেয়ে অধিক ক্ষমতাবান। হঠাৎ পিছন দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সে আল্লাহর ওয়াস্তে আযাদ। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ শোন! যদি তুমি তা না করতে তাহলে অবশ্যই (জাহান্নামের) আগুন তোমাকে ঝলসে দিত। কিংবা (তিনি বললেন) আগুন তোমাকে অবশ্যই-স্পর্শ করতো। (( সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) | হাদিস: ৪১৬২ | Sahih Muslim (Islamic foundation), Hadith No. 4162 ))

এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ ক্রীতদাসের প্রতি কঠোর আচরণকে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এমনকি একজন দাসকে প্রহার করার পরিণতি সম্পর্কে তিনি এত কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন যে, সাহাবি (রা.) সঙ্গে সঙ্গে তাকে মুক্ত করে দেন এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ এ কাজকে সমর্থন করেন।

এখান থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। যারা দাবি করেন যে ইসলাম দাসীদের সঙ্গে জোরপূর্বক সহবাসের অনুমতি দিয়েছে, তাদের এই দাবিকে ইসলামী উৎসের সামগ্রিক শিক্ষার আলোকে যাচাই করা প্রয়োজন।

জোরপূর্বক সহবাসের বাস্তব অর্থ হলো একজন নারীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে শারীরিকভাবে দমন করা। এমন পরিস্থিতিতে বলপ্রয়োগ, আঘাত বা নির্যাতনের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই জড়িত থাকে। অথচ রাসুলুল্লাহ ﷺ একটি দাসকে প্রহার করার ঘটনাকেই এত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছেন যে, তার পরিণতি হিসেবে জাহান্নামের কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন এবং দাসকে মুক্ত করে দেওয়ার ঘটনাকে সমর্থন করেছেন।

অতএব, এই হাদিস ইসলামের সেই নৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করে যে, ক্রীতদাস বা দাসীর ওপর নির্যাতন ও জুলুম গ্রহণযোগ্য নয়। এ কারণে ইসলামী শরিয়ত দাসীদের সঙ্গে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগমূলক সহবাসকে বৈধ করেছে—এমন দাবি হাদিসের সামগ্রিক শিক্ষা ও ইসলামী নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং এটি ইসলামী উৎসগুলোর একপাক্ষিক ও বিকৃত উপস্থাপনার ফল।

নাস্তিকদের ফিকহী গ্রন্থের একপেশে উপস্থাপন ও সত্য ধামাচাপা

নাস্তিকদের কিছু ওয়েবসাইটে শাফেঈ মাজহাবের গ্রন্থ, যেমন রওজাতুত তালেবীন বা আল-মাওসূআতুল ফিকহিয়্যাহ থেকে এমন কিছু উদ্ধৃতি উপস্থাপন করা হয়, যেখানে বলা হয়েছে যে মনিবের সহবাসের আহ্বানে সাড়া দেওয়া দাসীর জন্য ওয়াজিব (বাধ্যতামূলক), আর অকারণে তা প্রত্যাখ্যান করলে সে নাশিযাহ (অবাধ্য) হিসেবে গণ্য হবে। এসব উদ্ধৃতি আংশিকভাবে উপস্থাপন করার ফলে সাধারণ পাঠকের মনে সহজেই ধারণা জন্মাতে পারে যে ইসলামে যুদ্ধবন্দী বা দাসী নারীর সঙ্গে জোরপূর্বক সহবাসের অনুমতি রয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখানে নাস্তিক লেখকরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গোপন করেন। তারা "ওয়াজিব" বা "বাধ্যতামূলক" হওয়ার ফিকহি অর্থকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন কোনো কাজ ওয়াজিব হওয়া মানেই সেই কাজ বলপ্রয়োগ করে আদায় করে নেওয়ার বৈধতা রয়েছে। অথচ ইসলামী ফিকহে এই দুই বিষয় এক নয়। কোনো কর্তব্য পালন করা ওয়াজিব হওয়া এবং সেই কর্তব্য বাস্তবায়নের জন্য শারীরিক জবরদস্তির অনুমতি থাকা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়।

বরং শাফেঈ মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম শাফিঈ (রহ.) এবং একই মাজহাবের অন্যতম প্রখ্যাত ফকীহ ইমাম আল-হালিমী (রহ.) স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে সহবাস এমন একটি বিষয়, যেখানে কাউকে জোরপূর্বক বাধ্য করা বৈধ নয়। অর্থাৎ, দাসীর ওপর মনিবের আহ্বানে সাড়া দেওয়া শরয়ি দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হলেও, সেখান থেকে কখনোই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে মনিব তাকে বলপ্রয়োগ করে সহবাসে বাধ্য করতে পারবেন। তাই শুধুমাত্র "ওয়াজিব" বা "নুশূয" সম্পর্কিত ফতোয়া উদ্ধৃত করে জোরপূর্বক সহবাসের বৈধতা প্রমাণ করার চেষ্টা করা প্রকৃতপক্ষে চেরি পিকিং এবং ফিকহি বক্তব্যকে প্রসঙ্গচ্যুতভাবে উপস্থাপন করার একটি উদাহরণ।

মূলত স্কলারগণ যা বলতে চেয়েছেন তা হলো,

  • স্ত্রী ও দাসীর ওপর দায়িত্ব: ফিকহবিদরা বলেছেন, বিবাহ বা মালিকানার চুক্তির মূল শর্ত হলো দাম্পত্য ও যৌন অধিকার। তাই কোনো শরীয়তি ওজর (যেমন: অসুস্থতা, ঋতুস্রাব) ছাড়া স্বামী বা মনিব ডাকলে সাড়া দেওয়া স্ত্রী বা দাসীর ধর্মীয় ও আইনি দায়িত্ব (Duty)। এটি না করলে সে ধর্মীয়ভাবে গুনাহগার হবে বা ‘নূশূজ’ (অবাধ্য) হিসেবে গণ্য হবে।

  • মনিব/স্বামীর সীমা: অবাধ্য হওয়া বা সাড়া না দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, স্বামী বা মনিব তাকে শারীরিকভাবে প্রহার করে, আঘাত করে বা জোরজবরদস্তি করে সহবাস (Rape/Forced Sex) করতে পারবে। ইমাম শাফিঈ (র.) স্পষ্টভাবে বলেছেন, সহবাস হলো ‘তালান্নুজ’ বা আনন্দ/তৃপ্তির বিষয়, এতে কাউকেই জোর করা যায় না।

একটি সহজ উপমা দিয়ে বিষয়টি সহজে বোঝার চেষ্টা করি, কোনো ব্যক্তি যদি চুক্তি অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য থাকে, কিন্তু সে কাজ না করে, তবে সে চুক্তিভঙ্গকারী বা অপরাধী। কিন্তু আইন বা মালিক তাকে পিটিয়ে বা জোর করে সেই কাজ করিয়ে নিতে পারে না। শরীয়তে অপরাধের জন্য শাস্তি দেওয়ার একতিয়ার বিচারকের (কাজী), কোনো ব্যক্তির নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার অধিকার নেই। 

বিষয় ইমাম শাফিঈ / ইমাম হালিমি  রওজাতুত তালেবীন / ফিকহ গ্রন্থসমূহ 
দৃষ্টিভঙ্গি  মানবিক নীতি ও সম্পর্কের প্রকৃতি (সহবাস আনন্দ ও সম্মতির বিষয়, আঘাত বা বলপ্রয়োগ করা যাবে না)।  আইনি ও ধর্মীয় বিধান (সাড়া দেওয়া স্ত্রী/দাসীর কর্তব্য, না দিলে সে পাপী হবে)। 
অধিকার  মনিব/স্বামী গায়ের জোরে বা ক্ষতি করে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না।  সাড়া না দিলে তা মনিব/স্বামীর অধিকার লঙ্ঘন বা ‘নূশূজ’ বলে গণ্য হবে। 
সমাধান  জোর না করে বিক্রি করা, বিচ্ছিন্ন হওয়া বা নূশূজ প্রয়োগ করা।  অবাধ্যতার কারণে খোরপোষ বা আনুষঙ্গিক অধিকার স্থগিত হওয়া। 

কাজেই, কোনো কাজ শরীয়তে ওয়াজিব বা অধিকার হিসেবে নির্ধারিত হওয়া মানেই এই নয় যে, সেই অধিকার বলপ্রয়োগ করে আদায় করে নেওয়া বৈধ। ইসলামী শরীয়তে একটি দায়িত্ব বা অধিকার থাকা এবং সেই অধিকার বাস্তবায়নের জন্য শারীরিক জবরদস্তির অনুমতি থাকা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়।

এটি একটি সহজ উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা যায়। যদি নামক একজন মুসলিমকে নামক আরেকজন মুসলিম সালাম দেন, তাহলে ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী -এর ওপর সালামের জবাব দেওয়া ওয়াজিব। সালামের জবাব পাওয়া -এর একটি শরয়ি অধিকার। যদি ইচ্ছাকৃতভাবে জবাব না দেন, তবে তিনি গুনাহগার হবেন এবং আল্লাহর নির্ধারিত একটি বিধান লঙ্ঘন করবেন। কিন্তু এখান থেকে কখনোই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে -এর অধিকার রয়েছে -কে মারধর করে, ভয়ভীতি দেখিয়ে বা জোরপূর্বক তার মুখ থেকে সালামের জবাব আদায় করে নেওয়ার। কারণ শরীয়তে কোনো অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং সেই অধিকার বলপ্রয়োগ করে আদায় করার অনুমতি এক জিনিস নয়।

একই নীতি স্ত্রী বা দাসীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। শরয়ি কোনো ওজর না থাকলে স্বামীর বা মনিবের সহবাসের আহ্বানে সাড়া দেওয়া স্ত্রী বা দাসীর দায়িত্ব হিসেবে গণ্য হয়েছে। তারা অকারণে তা প্রত্যাখ্যান করলে ফিকহের পরিভাষায় নূশূয (অবাধ্যতা) সংঘটিত হবে এবং তারা ধর্মীয়ভাবে দায়ী হবে। কিন্তু এই দায়িত্ব থেকে কখনোই এ সিদ্ধান্ত আসে না যে স্বামী বা মনিব গায়ের জোরে, মারধর করে, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বা জোরপূর্বক সহবাস করতে পারবেন। বরং শাফেঈ মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম শাফিঈ (রহ.) এবং একই মাজহাবের অন্যতম বিশিষ্ট আলেম ইমাম আল-হালিমী (রহ.) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে সহবাসের ক্ষেত্রে জবরদস্তি বৈধ নয়।

ফিকহি গ্রন্থগুলোতেও দেখা যায়, যদি স্ত্রী বা দাসী শরয়ি অধিকার লঙ্ঘন করেন, তাহলে তার প্রতিকার হিসেবে বলপ্রয়োগের কথা বলা হয়নি। বরং শরীয়ত যে বৈধ উপায়গুলো নির্ধারণ করেছে, সেগুলোর কথাই বলা হয়েছে। যেমন, নূশূযের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক অধিকার স্থগিত হওয়ার আলোচনা এসেছে। আবার ইমাম আল-হালিমী (রহ.) দাসীর ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন, যদি সে সহবাসে স্থায়ীভাবে অনাগ্রহী হয় এবং এর ফলে সম্পর্কের উদ্দেশ্য পূরণ না হয়, তাহলে মনিব তাকে বিক্রি করে সমস্যার সমাধান করতে পারেন। অর্থাৎ, শরীয়ত সমস্যার সমাধান হিসেবে বলপ্রয়োগ বা জোরপূর্বক সহবাসের অনুমতি দেয়নি; বরং বৈধ ও আইনসম্মত বিকল্প পথ নির্দেশ করেছে।

অতএব, "সহবাসে সাড়া দেওয়া ওয়াজিব" এই বক্তব্য থেকে "জোরপূর্বক সহবাস বৈধ" এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো একটি গুরুতর যুক্তিগত ভ্রান্তি। কারণ শরীয়তে কোনো কর্তব্য বা অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং তা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আদায় করার বৈধতা একই বিষয় নয়। 

  • আইনি ও ধর্মীয় কর্তব্য (Duty): ইসলামী বিধান অনুযায়ী সালামের উত্তর দেওয়া যেমন ওয়াজিব এবং উত্তর পাওয়া সালামদাতার অধিকার, ঠিক তেমনি শরীয়তি বাধা না থাকলে সহবাসের ডাকে সাড়া দেওয়া স্ত্রী বা দাসীর জন্য একটি দায়িত্ব/কর্তব্য। এই উত্তর না দেওয়া বা সাড়া না দেওয়াটা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পাপ বা অধিকার লঙ্ঘন (নূশূজ)।

  • বলপ্রয়োগের নিষেধাজ্ঞা (Prohibition of Coercion): সালামের উত্তর না দিলে যেমন সালামদাতা তাকে প্রহার করে, মুখে হাত দিয়ে টেনে বা জোরজবরদস্তি করে উত্তর নেওয়া বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার রাখে না, ঠিক তেমনি স্বামী বা মনিবও স্ত্রী বা দাসী অসম্মতি জানালে গায়ের জোরে, মারধর করে বা শারীরিক নির্যাতন করে সহবাস (Forced Sex) করার অধিকার রাখে না।

  • আইনি প্রতিকার (Legal Remedy): সালামের উত্তর না দিলে যেমন সমাধান হলো তাকে নসীহত করা বা সমাজ-বিচারের ওপর ছেড়ে দেওয়া, তেমনি ফিকহে বলা হয়েছে—স্ত্রী বা দাসী সহবাসে সাড়া না দিলে মনিব/স্বামী গায়ের জোর খাটানোর বদলে তার খোরপোষ বন্ধ বা স্থগিত করতে পারে (নূশূজ), অথবা ইমাম হালিমির মতে দাসী অনাগ্রহী হলে তাকে বিক্রি করে দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে পারে।

অর্থনৈতিক ও আইনি সুরক্ষাকবচ: ‘অসহায়ত্বের’ অপপ্রচারের জবাব

সমালোচকদের একটি প্রচলিত দাবি হলো, দাসীরা নাকি খোরপোষ, আশ্রয় বা জীবিকার ভয় থেকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মনিবের সঙ্গে সহবাসে সম্মতি দিতে বাধ্য হতো। কিন্তু ইসলামী আইন ও অর্থনৈতিক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ ইসলাম দাস-দাসীদের মুক্তির জন্য একাধিক আইনি ও আর্থিক ব্যবস্থা প্রণয়ন করেছে, যা তাদেরকে সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় রেখে দেয়নি।

মুকাতাবা (মুক্তির চুক্তি): স্বাধীন হওয়ার আইনি অধিকার

ইসলামী শরীয়তে কোনো দাস বা দাসী স্বাধীন হতে চাইলে সে তার মনিবের সঙ্গে মুকাতাবা (مكاتبة) বা মুক্তির চুক্তি করতে পারে। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,

আর যাদের বিবাহের সামর্থ্য নেই আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে। আর তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীদের মধ্যে যারা মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তি করতে চায় তাদের সাথে তোমরা লিখিত চুক্তি কর, যদি তোমরা তাদের মধ্যে কল্যাণ আছে বলে জানতে পার এবং আল্লাহ তোমাদেরকে যে সম্পদ দিয়েছেন তা থেকে তোমরা তাদেরকে দাও। তোমাদের দাসীরা সতীত্ব রক্ষা করতে চাইলে তোমরা দুনিয়ার জীবনের সম্পদের কামনায় তাদেরকে ব্যভিচারে বাধ্য করো না। আর যারা তাদেরকে বাধ্য করবে, নিশ্চয় তাদেরকে বাধ্য করার পর আল্লাহ তাদের প্রতি অত্যন্ত ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। (( সূরা আন-নূর (An-Nur) আয়াত ৩৩ - বাংলা অনুবাদ, তাফসীর ও তাজউইদ ))

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সহীহ বুখারীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। ক্রীতদাস সীরীন তাঁর মনিব আনাস ইবনু মালিক (রা.)-এর কাছে মুকাতাবার আবেদন করেন। প্রথমে আনাস (রা.) এতে সম্মতি দেননি। তখন সীরীন বিষয়টি খলিফা উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর নিকট উপস্থাপন করেন। উমার (রা.) আনাস (রা.)-কে ভর্ত্সনা করেন, বেত্রাঘাত করেন এবং উপরোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করে মুকাতাবা সম্পাদনের নির্দেশ দেন। (( সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) | হাদিস: ২৫৬০ | Sahih al-Bukhari, Hadith No. 2560 ))

এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, মুকাতাবার আবেদনকে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। এমনকি বহু ফকীহের মতে, যদি দাস বা দাসী চুক্তির শর্ত পূরণে সক্ষম হয়, তাহলে মনিবের জন্য মুকাতাবা গ্রহণ করা ওয়াজিব

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুকাতাবা চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই দাসী আর মনিবের ভোগদখলাধীন সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত থাকে না। ফলে মনিবের পূর্ববর্তী যৌন অধিকার সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং তিনি তার সঙ্গে সহবাস করতে পারেন না।

বায়তুল মাল ও জাকাত: মুক্তির জন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অর্থায়ন

ইসলাম শুধু মুক্তির আইনি পথই তৈরি করেনি, বরং সেই মুক্তিকে বাস্তবায়নের জন্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছে।

পবিত্র কুরআনে জাকাতের আটটি নির্ধারিত খাতের একটি হলো "ফি রিকাব" (وفي الرقاب), অর্থাৎ দাস-দাসীদের মুক্ত করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 

সদাক্বাহ হল ফকীর, মিসকীন ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মচারী ও যাদের মন জয় করা উদ্দেশ্য তাদের জন্য, দাসমুক্তি ও ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে (ব্যয়ের জন্য) আর মুসাফিরের জন্য। এটা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ফরয। আর আল্লাহ হলেন সর্বজ্ঞ, মহাবিজ্ঞানী। (( সূরা আত-তাওবা (At-Tawba) আয়াত ৬০ - বাংলা অনুবাদ, তাফসীর ও তাজউইদ ))

এর অর্থ হলো, কোনো দাস বা দাসী মুকাতাবার অর্থ পরিশোধে অসুবিধায় পড়লে তাকে একা ছেড়ে দেওয়া হতো না। রাষ্ট্রীয় বায়তুল মাল এবং সমাজের জাকাত তহবিল থেকে অর্থ সহায়তা দিয়ে তাকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করা হতো। অর্থাৎ, ইসলাম দাসমুক্তিকে কেবল ব্যক্তিগত সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল রাখেনি; বরং এটিকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়িত্বের অংশে পরিণত করেছে।

অতএব, "দাসীরা খোরপোষ হারানোর ভয়ে বাধ্য হয়ে সহবাসে সম্মতি দিত" এমন সাধারণীকৃত দাবি ইসলামী আইন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে না। কারণ ইসলাম একদিকে দাস বা দাসীর জন্য স্বাধীন হওয়ার একটি স্বীকৃত আইনি পথ (মুকাতাবা) নির্ধারণ করেছে, অন্যদিকে সেই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অর্থায়নের ব্যবস্থাও রেখেছে। ফলে তাদেরকে সম্পূর্ণ অসহায় ও বিকল্পহীন অবস্থায় কল্পনা করা ঐতিহাসিক ও ফিকহি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আওতাসের বন্দিনী নারীদের হাদিস নিয়ে অমুসলিমদের মিথ্যাচার

আওতাসের যুদ্ধবন্দিনী নারীদের ঘটনা নিয়ে অমুসলিমদের মধ্যে বেশ কিছু বিভ্রান্তিকর দাবি প্রচলিত রয়েছে। কখনো বলা হয়, মুসলিমরা নাকি নারীদের তাদের স্বামীদের সঙ্গে বন্দী করেছিল এবং স্বামীদের সামনেই তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে জোরপূর্বক সহবাস করেছিল। এমনকি এই ঘটনাকে ইসলামে ধর্ষণের অনুমোদনের ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়।

কিন্তু মূল হাদিস এবং ঘটনার পূর্ণ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে এই চিত্রের সঙ্গে প্রামাণ্য বর্ণনার গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য দেখা যায়। হাদিসে কোথাও বলা হয়নি যে বন্দিনী নারীদের স্বামীরাও মুসলিমদের হাতে বন্দী ছিলেন, তাদের সামনে সহবাস সংঘটিত হয়েছিল কিংবা কোনো নারীকে শারীরিকভাবে প্রতিরোধ করা সত্ত্বেও জোরপূর্বক সহবাস করা হয়েছিল। বরং সংশ্লিষ্ট বর্ণনাগুলোতে মূল আলোচনা ছিল বন্দিত্বের পর পূর্ববর্তী বিবাহের শরয়ি অবস্থান এবং কখন তাদের সঙ্গে বৈধ সম্পর্ক স্থাপন করা যেতে পারে।

এ অভিযোগের স্বপক্ষে অমুসলিমরা যে হাদিস নিয়ে আসে তা হলো;

পরিচ্ছেদঃ ৪৫. বন্দী দাসীদের সাথে সঙ্গম করা

২১৫৫। আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। হুনাইনের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আওতাসের দিকে একদল সৈন্য পাঠালেন। তারা শত্রুর মুকাবিলায় অবতীর্ণ হয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং তাদের উপর বিজয়ী হয়ে তাদের নারীদেরকে বন্দী করে আনেন। কিন্তু সেই বন্দী নারীদের মুশরিক স্বামীরা বর্তমান থাকায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কতিপয় সাহাবী তাদের সাথে সঙ্গম করাকে গুনাহ মনে করেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ এ আয়াতটি অবতীর্ণ করলেনঃ ’’যে মহিলাদের স্বামী আছে তারা তোমাদের জন্য হারাম। তবে তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত’’ (সূরা আন-নিসাঃ ২৪) অর্থাৎ যুদ্ধবন্দী দাসী যখন তাদের ইদ্দাতকাল সমাপ্ত করবে তখন তারা তোমাদের জন্য বৈধ। (( সুনান আবূ দাউদ (আলবানী একাডেমী) | হাদিস: ২১৫৫ | Sunan Abu Dawood, Hadith No. 2155 ))

এই হাদিসের উপর ভিত্তি করে অমুসলিমরা দাবি করেন, আওতাসের এই বন্দি নারীদের নাকী তাদের স্বামীদের সাথে বন্দি করা হয়েছে এবং স্বামীদের সামনেই ধর্ষণ করা হয়েছে। এখানে দুইটি দাবি; 

  • নারীদের তাদের স্বামীর সাথেই বন্দি করা হয়েছে।
  • নারীদের স্বামীদের সামনেই ধর্ষণ করা হয়েছে।

বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য আমাদের জানা প্রয়োজন আওতাস ও হুনাইনের যুদ্ধ কেন হয়েছিল? আওতাসের নারীদের কি স্বামীর সাথেই বন্দি করা হয়েছে? নারীদের কী স্বামীর সামনেই ধর্ষণ করা হয়েছে?

আওতাস ও হুনাইনের যুদ্ধ কেন হয়েছিল?

আওতাসের বন্দিনী নারীদের ঘটনা বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে হুনাইন ও আওতাসের যুদ্ধ কেন সংঘটিত হয়েছিল এবং কারা এই সংঘর্ষের প্রস্তুতি নিয়েছিল। কারণ পুরো প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে শুধু যুদ্ধবন্দিনী নারীদের অংশটুকু সামনে আনলে ঘটনাটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ধারণা তৈরি হতে পারে।

মক্কা বিজয়ের পর আরবের বিভিন্ন গোত্রের কাছে মুসলিমদের শক্তি ও প্রভাব অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু হাওয়াযিন ও সাকীফ গোত্রের কিছু লোক এই পরিবর্তনকে নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করে। তারা আশঙ্কা করছিল যে মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান শক্তির কারণে ভবিষ্যতে তাদের ওপরও প্রভাব বিস্তার হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে হাওয়াযিন গোত্রের নেতা মালিক ইবন আওফ আন নাসরী বিভিন্ন গোত্রকে একত্রিত করেন এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন।

আর রাহীকুল মাখতূম সহ বিভিন্ন সিরাত গ্রন্থে (( আর রাহিকুল মাখতুম; তাওহীদ পাবলিকেশন; পৃষ্টাঃ ৪৭৪-৪৭৭ )) উল্লেখ করা হয়েছে যে মালিক ইবন আওফের নেতৃত্বে হাওয়াযিন, সাকীফ এবং তাদের মিত্র কয়েকটি গোত্র মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তারা শুধু যোদ্ধাদের নিয়েই আসেনি, বরং নিজেদের নারী, শিশু, গবাদিপশু এবং সম্পদও সঙ্গে নিয়ে আসে। এরপর তারা আওতাস এলাকায় শিবির স্থাপন করে। এটি হুনাইনের নিকটবর্তী একটি উপত্যকা ছিল।

মালিক ইবন আওফের পরিকল্পনা ছিল যোদ্ধাদের পরিবার ও সম্পদ তাদের সঙ্গে রাখলে তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালানোর কথা চিন্তাও করবে না। কারণ পরাজিত হলে নিজেদের নারী, শিশু ও সম্পদ শত্রুর হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই সে ইচ্ছাকৃতভাবেই নারী, শিশু এবং সম্পদ যুদ্ধাভিযানের সঙ্গে নিয়ে এসেছিল।

তবে হাওয়াযিনের প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নেতা দুরাইদ ইবনুস সিম্মাহ এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি মালিক ইবন আওফকে প্রশ্ন করেন, যুদ্ধক্ষেত্রে নারী, শিশু ও সম্পদ সঙ্গে আনার প্রয়োজন কী? তাঁর মতে, যুদ্ধে বিজয়ী হলে এসব সঙ্গে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই, আর পরাজিত হলে এগুলোই শত্রুর হাতে পড়ে যাবে। তিনি মালিককে পরামর্শ দেন নারী, শিশু ও সম্পদ নিরাপদ স্থানে রেখে শুধু যোদ্ধাদের নিয়ে যুদ্ধ করতে। কিন্তু মালিক ইবন আওফ তার পরামর্শ গ্রহণ করেননি। তার যুক্তি ছিল, প্রত্যেক যোদ্ধার পরিবার ও সম্পদ সঙ্গে থাকলে তারা সেগুলো রক্ষার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধ করবে এবং পিছু হটবে না।

এরপর রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কাছে সংবাদ পৌঁছে যে হাওয়াযিন ও তাদের মিত্ররা মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৃহৎ বাহিনী নিয়ে সমবেত হয়েছে। পরিস্থিতি যাচাইয়ের জন্য মুসলিমদের পক্ষ থেকে গোয়েন্দা পাঠানো হয়। খবর নিশ্চিত হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ ﷺ মুসলিম বাহিনী নিয়ে মক্কা থেকে হুনাইনের দিকে অগ্রসর হন।

মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা তখন প্রায় বারো হাজার। এর মধ্যে মক্কা বিজয়ে অংশগ্রহণকারী প্রায় দশ হাজার মুসলিমের সঙ্গে মক্কার সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী আরও প্রায় দুই হাজার ব্যক্তি যুক্ত হয়েছিলেন। অন্যদিকে হাওয়াযিনের বাহিনী আগেই হুনাইন উপত্যকার আশপাশে অবস্থান নিয়ে রেখেছিল। তারা এমন জায়গায় লুকিয়ে অবস্থান নেয়, যেখান থেকে মুসলিম বাহিনীর ওপর হঠাৎ আক্রমণ করা সম্ভব ছিল। 

হুনাইন উপত্যকায় অতর্কিত আক্রমণ

মুসলিম বাহিনী হুনাইন উপত্যকায় প্রবেশ করার পরপরই হাওয়াযিন বাহিনী তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। সীরাত গ্রন্থের  বর্ণনা অনুযায়ী, শত্রুপক্ষ সংকীর্ণ গিরিপথ ও পাহাড়ি এলাকায় আগে থেকেই গোপনে অবস্থান করছিল। মুসলিম বাহিনী উপত্যকায় প্রবেশ করামাত্র বিভিন্ন দিক থেকে তাদের ওপর তীরবৃষ্টি শুরু হয়। আক্রমণ এতটাই আকস্মিক ও প্রচণ্ড ছিল যে মুসলিম বাহিনীর প্রথম সারিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং অনেকেই পিছু হটতে শুরু করেন।

অর্থাৎ যুদ্ধের সূচনা মুসলিমদের পক্ষ থেকে ঘুমন্ত বা নিরস্ত্র কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর আকস্মিক আক্রমণের মাধ্যমে হয়নি। বরং হাওয়াযিন ও তাদের মিত্ররা আগে থেকেই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে অবস্থান করেছিল এবং হুনাইন উপত্যকায় প্রবেশের পর মুসলিম বাহিনীর ওপর তারাই প্রথম অতর্কিত আক্রমণ চালায়।

প্রথম ধাক্কায় মুসলিম বাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেও রাসুলুল্লাহ ﷺ যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করেননি। তিনি অল্পসংখ্যক সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে অবস্থান করেন এবং মুসলিমদের পুনরায় একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানান। ধীরে ধীরে মুসলিমরা আবার যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসে এবং নিজেদের সারি পুনর্গঠন করে। এরপর যুদ্ধের পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে শুরু করে। মুসলিমরা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত হাওয়াযিন বাহিনী পরাজিত হয়।

হাওয়াযিনের নারীরা মুসলিমদের হাতে কীভাবে বন্দী হলো?

হাওয়াযিনের নারীরা কোনো শান্তিপূর্ণ জনপদে নিজেদের ঘরে অবস্থানরত অবস্থায় মুসলিমদের হাতে বন্দী হননি। বরং হাওয়াযিনের নেতা মালিক ইবন আওফ নিজেই তাদের নারী, শিশু, গবাদিপশু ও সম্পদ নিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধাভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং আওতাস এলাকায় সামরিক শিবির স্থাপন করেছিলেন।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বলতে শুধু সেই ব্যক্তিকেই বোঝায় না, যে নিজের হাতে তলোয়ার বা অস্ত্র নিয়ে সরাসরি শত্রুর ওপর আক্রমণ করছে। একটি যুদ্ধবাহিনী পরিচালিত হয় বিভিন্ন ধরনের মানুষের সম্মিলিত ভূমিকার মাধ্যমে। কেউ সরাসরি যুদ্ধ করে, কেউ যুদ্ধের পরিকল্পনা করে, কেউ খাদ্য প্রস্তুত করে, কেউ প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করে, কেউ আহতদের পরিচর্যা করে, আবার কেউ যুদ্ধরত বাহিনীর অন্যান্য প্রয়োজন পূরণ করে। অর্থাৎ প্রত্যেকের হাতে অস্ত্র না থাকলেও তারা সামগ্রিক যুদ্ধাভিযানের অংশ হতে পারে।

হাওয়াযিনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। তাদের নারী ও সম্পদ দুর্ঘটনাক্রমে যুদ্ধক্ষেত্রে এসে পড়েনি। মালিক ইবন আওফ ইচ্ছাকৃত যুদ্ধকৌশল হিসেবেই তাদের সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। তার পরিকল্পনা ছিল, যোদ্ধাদের পরিবার ও সম্পদ তাদের পেছনে থাকলে তারা সেগুলো রক্ষা করার তাগিদে আরও দৃঢ়ভাবে যুদ্ধ করবে এবং যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালাবে না। অর্থাৎ নারী ও সম্পদের উপস্থিতিকেই তিনি নিজের সামরিক কৌশলের একটি উপাদান বানিয়েছিলেন।

এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিলেন হাওয়াযিনেরই প্রবীণ ও অভিজ্ঞ যোদ্ধা দুরাইদ ইবনুস সিম্মাহ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পরিবার ও সম্পদ যুদ্ধাভিযানে নিয়ে আসার ফল কী হতে পারে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন পরাজিত হলে নারী, শিশু ও সম্পদ বিজয়ী বাহিনীর হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি। মালিক ইবন আওফ তার এই সতর্কতা গ্রহণ করেননি।

শেষ পর্যন্ত ঠিক সেই ঘটনাই ঘটে। হুনাইন উপত্যকায় হাওয়াযিন বাহিনী পূর্বপরিকল্পিতভাবে অবস্থান নিয়ে মুসলিমদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করে। প্রথম আক্রমণে মুসলিম বাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেও পরবর্তীতে তারা পুনরায় সংগঠিত হয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। একপর্যায়ে হাওয়াযিন বাহিনী পরাজিত হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং তাদের যোদ্ধারা বিভিন্ন দিকে পালিয়ে যায়। কিন্তু যুদ্ধাভিযানের সঙ্গে নিয়ে আসা নারী, শিশু, গবাদিপশু ও সম্পদ যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে যায় এবং বিজয়ী মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দি হয়।

অতএব ঘটনাটি এমন নয় যে মুসলিমরা কোনো শান্তিপূর্ণ গ্রামে হামলা করে সেখানকার নারী ও শিশুদের বাড়িঘর থেকে তুলে এনে বন্দী করেছিল। বাস্তব ঘটনা হলো, হাওয়াযিনের নেতৃত্ব নিজেরাই মুসলিমদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল এবং নিজেদের পরিবার ও সম্পদকে সেই যুদ্ধাভিযানের অংশ হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে এসেছিল। যুদ্ধের ফল তাদের বিপক্ষে যাওয়ার পর যোদ্ধারা পালিয়ে গেলে তাদের সঙ্গে আনা লোকজন ও সম্পদ বিজয়ী বাহিনীর হাতে পড়ে।

আওতাসের বন্দিনী নারীদের স্বামীরা কি তাদের সামনে বন্দী ছিলেন?

না। সংশ্লিষ্ট হাদিস কিংবা ঐতিহাসিক বর্ণনায় এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না যে আওতাসের বন্দিনী নারীদের স্বামীরাও মুসলিমদের হাতে বন্দী ছিলেন কিংবা স্ত্রীদের সামনে উপস্থিত ছিলেন। বরং ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম থেকে বোঝা যায়, ওই নারীদের স্বামীরা মুসলিমদের বন্দিশিবিরে ছিলেন না। তারা যুদ্ধের পর নিজেদের গোত্রের মধ্যেই অবস্থান করছিলেন।

হাদিসে বন্দিনী নারীদের স্বামীরা তখনও “বর্তমান” ছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু এই “বর্তমান” কথাটি শুনে অনেকের মনে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে স্বামীরাও হয়তো স্ত্রীদের সঙ্গে একই স্থানে বন্দী ছিলেন। তাই বিষয়টি শুধু একটি শব্দের অনুবাদের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি ঐতিহাসিক ঘটনাক্রমের আলোকে দেখা প্রয়োজন।

ইবন হাজার আসকালানী র. এর বিখ্যাত ফাতহুল বারীসহ বিভিন্ন সীরাতগ্রন্থের তথ্যের ভিত্তিতে আল্লামা ইদরীস কান্ধলভী র. সীরাতুল মুস্তফা ﷺ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: 

নবী (সা) তায়েফ থেকে রওয়ানা হয়ে ৫ যিলকাদা জি'রানা পৌঁছেন। সেখানে গনীমতের মালসমূহ জমা করা হয়েছিল। গনীমতের মালের মধ্যে ৬ হাজার বন্দী৩৪ হাজার উট৪০ হাজার বকরী এবং ৪ হাজার উকিয়া রৌপ্য ছিল। এখানে পৌঁছার পর নবী (সা) দশ দিনের অধিক হাওয়ায়িন গোত্রের অপেক্ষা করেন। হয়ত তারা স্বীয় আপনজনশিশু ও মহিলাদেরকে মুক্ত করে নেয়ার জন্য আগমন করবে। কিন্তু দশ দিন অপেক্ষা করার পরও যখন কেউ আগমন করেনিতখন নবী (সা) গনীমতের মালামাল যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। (( ফাতহুল বারী৮ খপৃ. ৩৮উয়ূনুল আসার২ খণ্ডপৃ. ১৯৩ ))

এই ইতিহাসের বর্ণনা দিয়ে ইবন হাজার আসকালানী(র.) এর সুবিখ্যাত ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থের বরাতে আল্লামা ইদরীস কান্ধলভী (র.) উল্লেখ করেছেন; 

নবী (সা) তায়েফ থেকে রওয়ানা হয়ে ৫ যিলকাদা জি'রানা পৌঁছেন। সেখানে গনীমতের মালসমূহ জমা করা হয়েছিল। গনীমতের মালের মধ্যে ৬ হাজার বন্দী, ৩৪ হাজার উট, ৪০ হাজার বকরী এবং ৪ হাজার উকিয়া রৌপ্য ছিল। এখানে পৌঁছার পর নবী (সা) দশ দিনের অধিক হাওয়ায়িন গোত্রের অপেক্ষা করেন। হয়ত তারা স্বীয় আপনজন, শিশু ও মহিলাদেরকে মুক্ত করে নেয়ার জন্য আগমন করবে। কিন্তু দশ দিন অপেক্ষা করার পরও যখন কেউ আগমন করেনি, তখন নবী (সা) গনীমতের মালামাল যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। (( ফাতহুল বারী, ৮ খ, পৃ. ৩৮; উয়ূনুল আসার, ২ খণ্ড, পৃ. ১৯৩ )) 

এরপর গনীমতের সম্পদ বণ্টনের পর হাওয়াযিন গোত্রের একটি প্রতিনিধিদল রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কাছে উপস্থিত হয়। এই বিষয়ে সীরাতুল মুস্তফা সাঃ’ গ্রন্থে আল্লামা ইদরীস কান্ধলভী(র.) উল্লেখ করেছেন

গনীমতের মাল বণ্টনের পর হাওয়ায়িন গোত্রের নয়জনের একটি দল রাসূল (সা)-এর খেদমতে উপস্থিত হয়। তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করার পর নবী (সা)-এর হাতে বায়‘আত গ্রহণ করেন। অতঃপর তাঁরা তাঁদের ধন-সম্পদ ও পরিবারবর্গ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আবেদন পেশ করেন। ...

... নবী (সা) ইরশাদ করেনআমার এবং বনী হাশিম ও বনী আবদুল মুত্তালিবের গোত্রের অংশে যা কিছু বণ্টন করে দেওয়া হয়েছেএ সমস্ত তোমাদের। কিন্তু অন্যান্য মুসলমানদের মধ্যে যা কিছু বণ্টন করা হয়েছে এ সম্পর্কে তোমরা যোহরের নামাযের পর দাঁড়িয়ে বলবেআমি তোমাদের জন্য সুপারিশ করব। সুতরাং যোহরের নামাযের পর হাওয়ায়িন গোত্রের প্রতিনিধি প্রাঞ্জল ভাষায় বক্তৃতার মাধ্যমে তাদের কয়েদীদের মুক্তির জন্য মুসলমানদের নিকট আবেদন পেশ করেন। অতঃপর রাসূল (সা) দাঁড়িয়ে প্রথমত আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করেন। এরপর বলেনতোমাদের এই ভাই হাওয়ায়িন ইসলাম গ্রহণ করে আগমন করেছে। আমি নিজের ও আমার গোত্রের অংশ তাদেরকে ফেরত দিয়েছি। অন্যান্য মুসলমানগণও তাদের কয়েদীদেরকে ফেরত দেওয়াটাকে আমি যথার্থ মনে করছি। যে ব্যক্তি আগ্রহে সন্তুষ্টি ও কল্যাণের উদ্দেশ্যে এরূপ করবেএটা তাদের জন্য উত্তম হবে। অন্যথায় আমি তাদের বিনিময় প্রদানের জন্য প্রস্তুত আছি। সবাই বললোআমরা কল্যাণের জন্য এতে সম্মত ও সন্তুষ্ট আছি। এভাবে ৬ হাজার কয়েদী একবারে আযাদ ও মুক্ত করে দেওয়া হয়। (( সীরাতুল মুস্তফা সাঃ (৩য় খণ্ড) - ইদরীস কান্ধলভী, পৃষ্ঠা ৬৯-৭০ ))

এই ঘটনাটি সহীহ হাদিস দ্বারাও প্রমাণিত। হাদিসে উল্লেখিত আছে, 

পরিচ্ছেদঃ ৫৭/১৫. যিনি বলেন, এক পঞ্চমাংশ মুসলিমদের প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশে।

مَا سَأَلَ هَوَازِنُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِرَضَاعِهِ فِيْهِمْ فَتَحَلَّلَ مِنْ الْمُسْلِمِيْنَ وَمَا كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَعِدُ النَّاسَ أَنْ يُعْطِيَهُمْ مِنْ الْفَيْءِ وَالْأَنْفَالِ مِنْ الْخُمُسِ وَمَا أَعْطَى الْأَنْصَارَ وَمَا أَعْطَى جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللهِ تَمْرَ خَيْبَرَ

এর প্রমাণঃ হাওয়াযিন, তাদের গোত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুধ পানের সৌজন্যে তারা যে আবেদন করছিল, তারই কারণে মুসলিমদের নিকট থেকে তাদের সে দাবী আদায় করিয়ে নেন। ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদেরকে ফায় ও গনীমত-এর অংশ নিকট হতে খুমুস দানের যে প্রতিশ্রুতি দান করতেন।’ ‘আর যা তিনি আনসারদের প্রদান করেছেন’ এবং ‘যা তিনি খায়বারের খেজুর হতে জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ্ (রাঃ)-কে দান করেছেন।’


৩১৩১-৩১৩২. ‘উরওয়াহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তাঁকে মারওয়ান ইবনু হাকাম ও মিসওয়ার ইবনু মাখরামাহ (রাঃ) রিওয়ায়াত করেছেন যে, যখন হাওয়াযিন গোত্রের প্রতিনিধি দল মুসলিম হয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল যে, তাদের মালামাল ও বন্দী উভয়ই ফেরত দেয়া হোক। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন, আমার নিকট সত্য কথা অধিকতর প্রিয়। তোমরা দু’য়ের মধ্যে যে কোন একটি গ্রহণ কর। বন্দী, নয় মালামাল। আর আমি তো তাদের (হাওয়াযিন গোত্রের) প্রতীক্ষা করেছিলাম আর তায়েফ হতে ফেরার সময় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশ দিন থেকে অধিক সময় তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। অবশেষে যখন তাদের নিকট স্পষ্ট হলো যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দু’টোর মধ্যে যে কোন একটিই ফেরত দিবেন, তখন তারা বলল, আমরা আমাদের বন্দীদের ফেরত লাভই পছন্দ করি। অতঃপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের সামনে দাঁড়ালেন। প্রথমে তিনি আল্লাহ তা‘আলার যথোপযুক্ত প্রশংসা করলেন। অতঃপর বললেন, তোমাদের এ সব ভাই তাওবা করে আমার নিকট এসেছে। আর আমি উচিত মনে করছি যে, তাদের বন্দীদের ফেরত দিব। যে ব্যক্তি সন্তুষ্টচিত্তে তা করতে চায়, সে যেন তা করে আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি চায় যে, তার অংশ বহাল থাকুক, সে যেন অপেক্ষা করে (কিংবা) আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে প্রথম যে গনীমতের মাল দান করেছেন, আমি তাকে তা হতে তা দিয়ে দিব, তাও করতে পারে। উপস্থিত লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা সন্তুষ্টচিত্তে তা গ্রহণ করলাম। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি সঠিক জানতে পারিনি, তোমাদের মধ্যে কে এতে সম্মতি দিয়েছে, আর কে দেয়নি। কাজেই, তোমরা ফিরে যাও এবং নিজ নিজ প্রতিনিধির মাধ্যমে আমাকে তোমাদের সিদ্ধান্ত জানাও। লোকেরা চলে গেল। আর তাদের প্রতিনিধিরা নিজেদের লোকের সঙ্গে আলোচনা করে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ফেরত এল এবং তাঁকে জানাল যে, তারা সন্তুষ্টচিত্তে সম্মতি দিয়েছে। হাওয়াযিনের বন্দীগণ সম্পর্কিত বিবরণ আমাদের নিকট এ রকমই পৌঁছেছে। (২৩০৭, ২৩০৮) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৮৯৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৯০৮)

এই ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম থেকে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে যায়। হাওয়াযিনের বন্দীদের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ ﷺ তাৎক্ষণিকভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। বরং তিনি দশ দিনেরও বেশি সময় অপেক্ষা করেছিলেন, যাতে তাদের গোত্রের লোকেরা এসে নিজেদের নারী, শিশু ও আপনজনদের ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়। কেউ না আসার পরেই বন্দীদের বণ্টন করা হয়। পরবর্তীতে হাওয়াযিনের প্রতিনিধিদল ফিরে এসে বন্দী ও সম্পদ ফেরত চাইলে বন্দীদের ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

এখন প্রশ্ন হলো, যদি বন্দিনী নারীদের স্বামীরাও তাদের সঙ্গে মুসলিমদের হাতে বন্দী থাকতেন, তাহলে রাসুলুল্লাহ ﷺ কেন তাদের স্বজন ও গোত্রের লোকদের ফিরে আসার জন্য দশ দিনেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতেন? একইভাবে, বন্দীদের মুক্ত করার জন্য পরবর্তীতে হাওয়াযিনের প্রতিনিধিদলের ফিরে আসার ঘটনাটিও প্রমাণ করে যে বন্দিনী নারীদের স্বামীরা বা তাদের গোত্রের পুরুষরা সবাই মুসলিমদের হাতে বন্দী ছিলেন না।

সুতরাং “আওতাসের বন্দিনী নারীদের স্বামীরাও একই সঙ্গে বন্দী ছিলেন” এমন দাবি ঐতিহাসিক ঘটনাক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অতএব, “নারীদের স্বামীরাও বন্দী ছিলেন” কিংবা “স্বামীদের চোখের সামনে তাদের স্ত্রীদের যৌনদাসীতে পরিণত করা হয়েছিল” এই ধরনের বর্ণনা মূল উৎসে পাওয়া ঘটনার বিবরণ নয়। বরং পূর্ণ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে ঘটনাটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করলে পাঠকের সামনে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বিভ্রান্তিকর চিত্র তৈরি হয়।

আওতাসের বন্দিনী নারীদের কি ধর্ষণ করা হয়েছিল?

এখানেই অমুসলিমরা সবচেয়ে প্রতারণাটি করে থাকে। হাদিসের মধ্যে আমরা দেখতে পায়, বন্দী নারীদের মুশরিক স্বামীরা বর্তমান থাকায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কতিপয় সাহাবী তাদের সাথে সঙ্গম করাকে গুনাহ মনে করেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ এ আয়াতটি অবতীর্ণ করলেনঃ ’’যে মহিলাদের স্বামী আছে তারা তোমাদের জন্য হারাম। তবে তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত’’ (সূরা আন-নিসাঃ ২৪) অর্থাৎ যুদ্ধবন্দী দাসী যখন তাদের ইদ্দাতকাল সমাপ্ত করবে তখন তারা তোমাদের জন্য বৈধ।

এখন পাঠন আপনারাই বলুন কোনো বন্দিনী নারীর সঙ্গে পরবর্তীতে সহবাস বৈধ হওয়ার বিধান বর্ণিত হওয়া এবং সেই নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা কি এক? এই দুটিতো সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি। তাই যারা সহবাস বৈধ হওয়ার বিধানকে জোরপূর্বক ধর্ষণ বলে প্রচার করতেছে তারা কী মিথ্যাচার করছে না? 

আওতাসের সংশ্লিষ্ট কোনো হাদিসেই এমন ঘটনা বর্ণিত হয়নি যে কোনো নারী সহবাসে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, শারীরিকভাবে বাধা দিয়েছিলেন এবং তারপর তার প্রতিরোধ ভেঙে জোরপূর্বক তার সঙ্গে সহবাস করা হয়েছিল।

হাদিসগুলোর আলোচ্য বিষয় ছিল মূলত দুটি:

  • প্রথমত, বন্দিত্বের কারণে তাদের পূর্ববর্তী মুশরিক স্বামীদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের শরয়ি অবস্থান কী হবে।
  • দ্বিতীয়ত, কোন সময়ের পর তাদের সঙ্গে সহবাস বৈধ হতে পারে।

মূল বিষয়টি হলো, দশদিন অতিক্রম হয়ে যাওয়ার পরেও হাওয়াযিন গোত্রের পুরুষরা নিজ স্ত্রীকে নিয়ে যাবার জন্য না এলে তাদের স্ত্রীদের সাহাবীদের মাঝে বণ্টন করে দেয়া হয়, যেই স্ত্রীরা ইতিমধ্যেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তখন সাহাবীরা নিজ অধিকারভুক্ত দাসীদের সাথে সহবাস করতে পারবেন কিনা সেই প্রশ্ন চলে আসে, এবং এর জবাবে কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়, যেখানে সেই নারীদের সাথে সহবাসকে বৈধ ঘোষণা করা হয়, কারণ তারা ইতোমধ্যেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। 

বন্দী হওয়ার পরপরই কি তাদের সঙ্গে সহবাসের সুযোগ ছিল?

আওতাস বা হাওয়াযিনের নারীদের বন্দী করার পরপরই তাদের সঙ্গে সহবাস করা হয়েছিল, এমন ধারণার বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। যুদ্ধের সময় এসব নারী ছিলেন আরবের মুশরিক সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। অথচ আহলে কিতাব ব্যতীত মুশরিক দাসীর সঙ্গে শুধু মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণেই সহবাস বৈধ হয়ে যায় না।

আল কুরআনে সুরা বাকারাহর ২২১ নং আয়াতে বলা হয়েছে –

وَ لَا تَنۡكِحُوا الۡمُشۡرِكٰتِ حَتّٰی یُؤۡمِنَّ ؕ

অর্থঃ "আর তোমরা মুশরিক নারীদের 'নিকাহ' করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে...

আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসির কুরতুবীতে বলা হয়েছে—

وَنَكَحَ أَصْلُهُ الْجِمَاعُ، وَيُسْتَعْمَلُ فِي التَّزَوُّجِ تَجَوُّزًا وَاتِّسَاعًا،

অর্থঃ “এবং "نَكَحَ" (নাকাহা) কথাটির মূল অর্থ হলো "সঙ্গম করা," তবে এটি রূপক অর্থে এবং ব্যাপক অর্থে "বিবাহ করা" অর্থেও ব্যবহার করা হয়।” (( তাফসির কুরতুবী, সুরা বাকারাহর ২২১ নং আয়াতের তাফসির, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৬৭ https://shamela.ws/book/20855/975 অথবা https://archive.is/wip/dpoDD (আর্কাইভকৃত) ))

ইমাম ইবনু কুদামা মাকদিসি(র.) তাঁর সুবিখ্যাত ‘আল মুগনি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন--

أَنَّ مَنْ حُرِّمَ نِكَاحُ حَرَائِرِهِمْ مِنْ الْمَجُوسِيَّات، وَسَائِرِ الْكَوَافِرِ سِوَى أَهْلِ الْكِتَابِ، لَا يُبَاحُ وَطْءُ الْإِمَاءِ مِنْهُنَّ بِمِلْكِ الْيَمِينِ. فِي قَوْل أَكْثَرِ أَهْلِ الْعِلْمِ، مِنْهُمْ؛ مُرَّةُ الْهَمْدَانِيُّ، وَالزُّهْرِيُّ، وَسَعِيدُ بْنُ جُبَيْرٍ، وَالْأَوْزَاعِيُّ، وَالثَّوْرِيُّ، وَأَبُو حَنِيفَةَ، وَمَالِكٌ، وَالشَّافِعِيُّ. وَقَالَ ابْنُ عَبْدِ الْبَرِّ: عَلَى هَذَا جَمَاعَةُ فُقَهَاءِ الْأَمْصَارِ، وَجُمْهُورُ الْعُلَمَاءِ، وَمَا خَالَفَهُ فَشُذُوذٌ لَا يُعَدُّ خِلَافًا.

অর্থঃ “যে সকল স্বাধীন নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম করা হয়েছে, যাদের মধ্যে আছে আহলে কিতাব ব্যতিত মাজুসী (Zoroastrians/অগ্নিপূজকদের) এবং অন্য সকল কাফির নারী। তাদের ক্ষেত্রে মালিকানার অধিকারেও দাসীদের সাথে সহবাস জায়েজ নয়। এটাই অধিকাংশ আলিমের বক্তব্য। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মুররাহ আল-হামদানি(র.), যুহরি(র.), সাঈদ বিন জুবাইর(র.), আওযায়ী(র.), সাওরি(র.), আবু হানিফা(র.), মালিক(র.) এবং শাফিঈ(র.)। ইবন আব্দুল বার(র.) বলেছেন: "এটাই বিভিন্ন অঞ্চলের ফকিহদের মত এবং অধিকাংশ আলিমের অভিমত। এর বিপরীত যে মত আছে, তা শুযুয (বিচ্ছিন্ন মত) এর অন্তর্ভুক্ত এবং সেটিকে কোনো মতপার্থক্য হিসেবেও গণ্য করা হয় না। (( আল মুগনি – ইবনু কুদামা মাকদিসি, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৩৪ https://shamela.ws/book/8463/2944 অথবা https://archive.is/wip/NCirL (আর্কাইভকৃত) ))

অতএব, শুধু একজন মুশরিক নারী যুদ্ধবন্দিনী হয়েছেন বলেই সঙ্গে সঙ্গে তার সঙ্গে সহবাস বৈধ হয়ে গেছে, বিষয়টি এমন নয়।কাজেই যেহেতু সেই বন্দীনিরা মুশরিক ছিলেন তাই তাদের সাথে সহবাসের সুযোগই ছিলো না।

আওতাসের নারীদের সঙ্গে সহবাস বৈধ হওয়ার আলোচনা কেন এসেছে?

এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, আওতাসের বন্দিনী নারীরা যদি মুশরিক হয়ে থাকেন এবং মুশরিক দাসীর সঙ্গে সহবাস বৈধ না হয়, তাহলে সাহাবীগণ তাদের সঙ্গে সহবাস বৈধ হবে কি না, তা নিয়ে কেন প্রশ্ন তুলেছিলেন?

জমহুর আলেমের ফিকহি ব্যাখ্যা অনুসারে ঘটনাটিকে এমনভাবে বোঝানো হয়েছে যে ওই নারীরা মুশরিক অবস্থায় সহবাসের জন্য বৈধ হননি (মুশরিক নারীদের সাথে সহবাস হারাম তা ইতোমধ্যেই দলিল সহ আলোচনা করা হয়েছে)। বরং ইসলাম গ্রহণ করার পর তাদের পূর্ববর্তী মুশরিক স্বামীদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক বাতিল হয়ে যায়। এরপরই সাহাবীদের সামনে প্রশ্ন আসে, তাদের স্বামীরা জীবিত থাকা অবস্থায় পূর্বের বিবাহের কারণে ওই নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক বৈধ হবে কি না। এই প্রেক্ষাপটেই সূরা আন নিসার ২৪ নম্বর আয়াতের বিধান আলোচিত হয়।

তাই হাদিসে “তাদের স্বামীরা বর্তমান ছিল” কিংবা তাদের সাথে সহবাস বৈধ হওয়া থেকে এমন ধারণা করা ঠিক নয় যে মুশরিক অবস্থায় নারীদের বন্দী করেই সঙ্গে সঙ্গে তাদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছিল।

বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হলেও সঙ্গে সঙ্গে সহবাসের অনুমতি ছিল না

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো বন্দিনী নারী সহবাসের জন্য শরিয়তসম্মতভাবে বৈধ হওয়ার পরেও সঙ্গে সঙ্গে তার সঙ্গে সহবাস করা যেত না। তার আগে ইস্তিবরা সম্পন্ন হওয়া আবশ্যক ছিল। তাই বৈধ হওয়ার পরেও তাদের সঙ্গে সহবাস করা সাহাবী(রা.)গণের পক্ষে সম্ভব ছিল না, কেননা যুদ্ধবন্দিনি নারীর সঙ্গে সহবাসের জন্য তাদের ইদ্দত পূর্ণ হবার শর্ত রয়েছে। আর যুদ্ধবন্দিনিদের ইদ্দত হল তাদের হায়েয হওয়া পর্যন্ত সময়কাল। যা সূরা নিসার ২৪ নং আয়াত এবং সেই হাদিসেই উল্লেখিত আছে যে, যে মহিলাদের স্বামী আছে তারা তোমাদের জন্য হারাম। তবে তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত’’ (সূরা আন-নিসাঃ ২৪) অর্থাৎ যুদ্ধবন্দী দাসী যখন তাদের ইদ্দাতকাল সমাপ্ত করবে তখন তারা তোমাদের জন্য বৈধ। 

অতএব, যুদ্ধের ময়দানে কোনো নারী বন্দী হলেন আর সঙ্গে সঙ্গেই কোনো সাহাবী তার সঙ্গে সহবাস করলেন, এমন ধারণা শরিয়তের এই বিধানের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক। সেই নারীদের সঙ্গে সহবাস হবার মতো সময় ছিল বলেও কোনো উল্লেখ আমরা ইতিহাসে পাই না। উপরন্তু সাহাবীগণ যেসব নারীকে তাদের স্বামীর নিকট ফিরিয়ে দেন। স্ত্রীরা আগে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, স্বামীরাও ইসলাম গ্রহণ করে স্ত্রীদের ফিরিয়ে নিয়ে যায়। ফলে আক্রমণকারী শত্রু থেকে পরিবর্তিত হয়ে তাঁরা পরিণত হন নবী() এর সম্মানিত সাহাবীতে। সবাই মুক্ত, স্বাধীন, যে যার পরিবারের কাছে ফিরে গেছে, সাথে করে নিয়ে গেছে দ্বীন ইসলামকে। এর থেকে উত্তম সমাপ্তি আর কী হতে পারে?

বন্দীদের বণ্টনের আগেও সহবাসের সুযোগ ছিল না

এর সঙ্গে হাওয়াযিনের ঘটনার পূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম যোগ করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। সহিহ বুখারিতে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ তায়েফ থেকে ফিরে হাওয়াযিনের লোকদের জন্য দশ দিনেরও বেশি সময় অপেক্ষা করেছিলেন এবং তাদের বন্দী ও সম্পদের বণ্টন বিলম্বিত রেখেছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন, তারা ফিরে এসে নিজেদের পরিবার ও সম্পদ ফেরত চাইবে।

এর অর্থ হলো, এই অপেক্ষার সময় বন্দিনী নারীদের কোনো নির্দিষ্ট সাহাবীর ব্যক্তিগত অংশ হিসেবেই চূড়ান্তভাবে বণ্টন করা হয়নি। ফলে “যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বন্দিনী নারীদের নিয়ে সহবাস শুরু হয়ে গিয়েছিল” এমন চিত্র ঐতিহাসিক ঘটনাক্রমের সঙ্গেও মেলে না।

এরপর হাওয়াযিনের প্রতিনিধিদল ইসলাম গ্রহণ করে ফিরে আসে এবং তাদের সম্পদ ও বন্দীদের ফেরত চায়। রাসুলুল্লাহ ﷺ তাদের দুটি বিষয়ের মধ্যে একটি বেছে নিতে বলেন। তারা নিজেদের বন্দীদের বেছে নেয়। এরপর মুসলিমদের সম্মতিক্রমে বন্দীদের ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

অর্থাৎ ঘটনাক্রমটি হলো:

নারীরা বন্দী হলেন। এরপর রাসুলুল্লাহ ﷺ হাওয়াযিনের লোকদের ফিরে আসার জন্য দশ দিনেরও বেশি অপেক্ষা করলেন। এই সময় বন্দীদের বণ্টন বিলম্বিত রাখা হলো। পরবর্তীতে বণ্টন হওয়ার পর হাওয়াযিনের প্রতিনিধিদল ফিরে এলো এবং বন্দীদের ফেরত চাইল। অবশেষে তাদের বন্দীদের ফিরিয়ে দেওয়া হলো।

এর পাশাপাশি সহবাসের ক্ষেত্রে পৃথকভাবে ইস্তিবরার শর্তও কার্যকর ছিল। এবং বন্টনের পূর্বে তো সহবাস হারাম। অতএব, বন্দী করার সঙ্গে সঙ্গেই ওই নারীদের সঙ্গে সহবাস করা হয়েছিল, এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হলে আলাদা ঐতিহাসিক প্রমাণ প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট হাদিসগুলো এমন কোনো ঘটনা বর্ণনা করে না।

তাহলে “স্বামীদের সামনে ধর্ষণ” দাবিটি কতটা যুক্তিসঙ্গত?

এখন পুরো ঘটনাটি একসঙ্গে বিবেচনা করা যাক।

প্রথমত, আগেই দেখানো হয়েছে যে বন্দিনী নারীদের স্বামীরা তাদের সামনে মুসলিমদের হাতে বন্দী ছিলেন, এমন কোনো প্রমাণ নেই।

দ্বিতীয়ত, নারীরা মুশরিক অবস্থায় থাকলে তাদের সঙ্গে সহবাসই বৈধ ছিল না। ইমাম নববীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী আলোচ্য হাদিসকে তাদের পরবর্তী ইসলাম গ্রহণের প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে।

তৃতীয়ত, কোনো বন্দিনী নারী সহবাসের জন্য বৈধ হলেও তার ইস্তিবরা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তার সঙ্গে সহবাস করা নিষিদ্ধ ছিল।

চতুর্থত, রাসুলুল্লাহ ﷺ হাওয়াযিনের লোকেরা ফিরে আসে কি না, সে জন্য দশ দিনেরও বেশি সময় অপেক্ষা করেছিলেন এবং এই সময় বন্দীদের বণ্টন বিলম্বিত রেখেছিলেন। আর বন্টের পূর্বে সহবাস নিষিদ্ধ।

পঞ্চমত, পরবর্তীতে হাওয়াযিনের প্রতিনিধিদল ফিরে এলে তারা সম্পদের পরিবর্তে নিজেদের বন্দীদের বেছে নেয় এবং মুসলিমদের সম্মতিক্রমে বন্দীদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

এই পূর্ণ ঘটনাক্রমের বিপরীতে যদি কেউ এমন একটি চিত্র তৈরি করেন যে মুসলিমরা যুদ্ধের ময়দান থেকেই নারীদের ধরে এনে তাদের স্বামীদের চোখের সামনে সঙ্গে সঙ্গে ধর্ষণ করতে শুরু করেছিলেন, তাহলে সেই বর্ণনা মূল হাদিস ও ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম থেকে পাওয়া যায় না।

এখন একজন নিরপেক্ষ পাঠক হিসেবে ঘটনাটি বিচার করুন। একদিকে রয়েছে মূল হাদিসের বর্ণনা, মুশরিক নারীদের সঙ্গে সহবাসের ফিকহি নিষেধাজ্ঞা, ইসলাম গ্রহণের বিষয়ে আলেমদের ব্যাখ্যা, ইস্তিবরার বাধ্যতামূলক অপেক্ষাকাল, বন্দীদের বণ্টনে দশ দিনেরও বেশি বিলম্ব এবং শেষ পর্যন্ত হাওয়াযিনের বন্দীদের নিজেদের সম্প্রদায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনা।

অন্যদিকে দাবি করা হচ্ছে, নারীদের স্বামীদের চোখের সামনেই তাদের বন্দী করে সঙ্গে সঙ্গে ধর্ষণ করা হয়েছিল। প্রশ্ন হলো, দ্বিতীয় বর্ণনাটি আসলে কোন প্রামাণ্য ঐতিহাসিক সূত্র থেকে এসেছে?

"স্বামীরা তখন বন্দী ছিল” আওতাসের হাদিসের ভুল অনুবাদকে নাস্তিকদের হাতিয়ার বানানো

হুনায়নের যুদ্ধ এবং আওতাসের বন্দিনী নারীদের যে হাদিসটি আমরা উপরে আলোচনা করেছি, একই হাদিস সুনান আবু দাউদেও বর্ণিত হয়েছে। (( সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) | হাদিস: ২১৫২ | Sunan Abu Dawood (Islamic foundation), Hadith No. 2152 )) কিন্তু দুঃখজনকভাবে হাদিসটির বাংলা অনুবাদে এমন একটি গুরুতর ভুল রয়েছে, যা পুরো ঘটনার অর্থই বদলে দেয়। আর ভুলকেই হারিয়ার বানিয়ে অমুসলিমরা ভুল অনুবাদকেই তাদের দাবির পক্ষে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। 

নাস্তিকদের ওয়েবসাইটে ব্যবহৃত সেই ভুল অনুদৃত হাদিসের স্ক্রিনশটঃ 

এই হাদিসের মূল আরবিতে বলা হয়েছে:

مِنْ أَجْلِ أَزْوَاجِهِنَّ مِنَ الْمُشْرِكِينَ

এর সরল অর্থ:

“তাদের মুশরিক স্বামীদের কারণে।”

কিন্তু সংশ্লিষ্ট বাংলা অনুবাদে লেখা হয়েছে:

“কেননা তাদের মুশরিক স্বামীরা তখন বন্দী ছিল।”

এখানেই মূল সমস্যা। আরবি বাক্যের কোথাও “তখন বন্দী ছিল” এমন কোনো কথা নেই। অর্থাৎ অনুবাদের মধ্যে এমন একটি তথ্য যোগ করা হয়েছে, যা মূল হাদিসে আদৌ উপস্থিত নয়।

আরবিতে কি লিখা রয়েছে তা সরাসরি দেখে নিনঃ

এই ভুল অনুবাদের ওপর ভিত্তি করেই অমুসলিমরা দাবি করেন, আওতাসে বন্দী হওয়া নারীদের সঙ্গে তাদের স্বামীরাও নাকি মুসলিমদের হাতে বন্দী ছিলেন। এরপর আরও একধাপ এগিয়ে এমন বক্তব্যও দেওয়া হয় যে স্বামীদের উপস্থিতিতেই তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে সহবাস করা হয়েছিল।

কিন্তু আগেই ঐতিহাসিক দলিলের আলোকে আমরা দেখিয়েছি, এই দাবি সঠিক নয়। হাওয়াযিনের পুরুষরা তখন মুসলিমদের বন্দিশিবিরে স্ত্রীদের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন, এমন কোনো প্রমাণ নেই। বরং রাসুলুল্লাহ ﷺ হাওয়াযিনের লোকেরা ফিরে এসে তাদের পরিবারবর্গ ও বন্দীদের মুক্ত করে নিয়ে যাবে কি না, সেই আশায় দশ দিনেরও বেশি সময় অপেক্ষা করেছিলেন।

বাংলা অনুবাদটির ভুল আরও সহজে ধরা যায় একই হাদিসের ইংরেজি অনুবাদ দেখলে। Sunnah.com এ হাদিসটির অনুবাদ করা হয়েছে: (( Sunan Abi Dawud 2155 - Marriage (Kitab Al-Nikah) - كتاب النكاح - Sunnah.com - Sayings and Teachings of Prophet Muhammad (صلى الله عليه و سلم) ))

(711) Chapter: Regarding Intercourse With Captives
Abu Sa’id Al Khudri said “The Apostle of Allaah(ﷺ) sent a military expedition to Awtas on the occasion of the battle of Hunain. They met their enemy and fought with them. They defeated them and took them captives. Some of the Companions of Apostle of Allaah (ﷺ) were reluctant to have relations with the female captives because of their pagan husbands. So, Allaah the exalted sent down the Qur’anic verse “And all married women (are forbidden) unto you save those (captives) whom your right hand posses.” This is to say that they are lawful for them when they complete their waiting period.

অর্থাৎ, রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কিছু সাহাবি বন্দিনী নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে দ্বিধাবোধ করেছিলেন তাদের মুশরিক স্বামীদের কারণে।” এখানে কোথাও বলা হয়নি যে তাদের স্বামীরা বন্দী ছিলেন। 

সরাসরি সুন্নাহ ডট এর হাদিসের স্ক্রিনশট দেখে নিনঃ

আরও মজার বিষয় হলো, এই ভুলটি যাচাই করার জন্য Sunnah.com পর্যন্ত যাওয়ারও প্রয়োজন নেই। HadithBD তে যে জায়গায় বাংলা অনুবাদে লেখা হয়েছে “তাদের মুশরিক স্বামীরা তখন বন্দী ছিল”, সেই একই হাদিসের English Translation অপশনে গেলেই দেখা যায়:

“Some of the Companions of Apostle of Allah (ﷺ) were reluctant to have relations with the female captives because of their pagan husbands.”

অর্থাৎ একই ওয়েবসাইটের ইংরেজি অনুবাদও মূল আরবির সঠিক অর্থই প্রকাশ করছে, কিন্তু বাংলা অনুবাদে ভুলভাবে “স্বামীরা তখন বন্দী ছিল” কথাটি যোগ করা হয়েছে। তাই এখানে বিষয়টি কোনো ব্যাখ্যাগত মতপার্থক্য নয়। মূল আরবি, ইংরেজি অনুবাদ এবং বাক্যের স্বাভাবিক অর্থ তিনটিই একদিকে, আর বাংলা অনুবাদের “স্বামীরা তখন বন্দী ছিল” কথাটি অন্যদিকে।

সরাসরি স্ক্রিনশট দেখে নিনঃ

অতএব, এই ভুল বাংলা অনুবাদের ওপর ভিত্তি করে “আওতাসের বন্দিনী নারীদের স্বামীরাও মুসলিমদের হাতে বন্দী ছিলেন” এমন ঐতিহাসিক দাবি করা গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো অনুবাদ ভুল হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অবশ্যই মূল আরবি পাঠকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। 

যুদ্ধবন্দী মানেই কি ‘যৌনদাসী’?

সংক্ষিপ্ত উত্তর: না। সমালোচকদের অভিযোগ হলো, মুসলিমরা নাকি যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত কাফির নারীদের বন্দি করে এনে তাদেরকে ‘যৌনদাসী’ বানাত। কিন্তু ইসলামী শরিয়তের বিধান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কিন্তু ইসলামী শরিয়তে যুদ্ধবন্দী হওয়া মাত্রই কোনো নারী দাসী হয়ে যায় না, কিংবা তার সঙ্গে সহবাস বৈধ হয়ে যায় না। যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপ্রধান গ্রহণ করেন। তিনি মুক্তি, মুক্তিপণ, বন্দি বিনিময়, শাস্তি বা দাসত্বসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাছাড়া সব দাসীর সঙ্গে সহবাস বৈধ নয়; কুরআন ও ফিকহে এ বিষয়ে একাধিক শর্ত ও বিধিনিষেধ রয়েছে। একই সঙ্গে ইসলাম দাস-দাসীদের বিবাহ ও মুক্তির পথও উন্মুক্ত করেছে। তাই "যুদ্ধবন্দী মানেই যৌনদাসী" বা "ইসলাম যুদ্ধবন্দী নারীদের ধর্ষণের অনুমতি দেয়" এই দাবি ইসলামী শরিয়তের সঠিক প্রতিফলন নয়। 

যুদ্ধবন্দী হলেই কেউ দাসী হয়ে যায় না

ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাষ্ট্রপ্রধান বা মুসলিমদের আমিরের। তিনি পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। যেমন,

  • নিঃশর্তভাবে মুক্তি দিতে পারেন।

  • মুক্তিপণের বিনিময়ে অথবা বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে ছেড়ে দিতে পারেন।

  • অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি দিতে পারেন।

  • অথবা দাস ও দাসীতে পরিণত করতে পারেন।

এছাড়া কোনো যুদ্ধবন্দীকে কার অধীনে দেওয়া হবে, সেটিও রাষ্ট্রপ্রধানের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। শাসক আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে কোনো যুদ্ধবন্দীকে নিজের দাস বা দাসী হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না।

এখন চিন্তা করুন, যদি ইসলামের উদ্দেশ্যই হতো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নারীদের বন্দি করে তাদেরকে যৌনদাসী বানানো, তাহলে এত দীর্ঘ আইনগত প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হতো না। বরং সরাসরি বলা হতো, "যুদ্ধবন্দী করো, তারপর সহবাস করো।" কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহতে এমন কোনো বিধান নেই।

কুরআন দাস-দাসীদের বিবাহের নির্দেশ দিয়েছে

আল্লাহ তাআলা বলেন,

আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী। (( সূরা আন-নূর (An-Nur) আয়াত ৩২ - বাংলা অনুবাদ, তাফসীর ও তাজউইদ )) 

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা দাস ও দাসীদের বিবাহ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হলো, যদি দাসী বানানোর মূল উদ্দেশ্যই হতো তাদেরকে কেবল যৌন ভোগের বস্তু বানানো, তাহলে আল্লাহ কেন তাদের বিবাহের নির্দেশ দিলেন? এই আয়াত থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ইসলামে "দাসী" মানেই "যৌনদাসী" নয়। দাসীরও একটি সামাজিক ও পারিবারিক জীবন রয়েছে, এবং ইসলাম সেই জীবনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। 

প্রত্যেক দাসীর সঙ্গে সহবাস বৈধ নয়

কুরআনে মুশরিক নারীদের বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একইভাবে ইসলামী ফিকহে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনো দাসী যদি মুশরিক হয়, তাহলে তার সঙ্গে সহবাস বৈধ নয়। এখন যদি যুদ্ধবন্দী নারী মানেই যৌনদাসী হতো, তাহলে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে এই নিষেধাজ্ঞার কোনো অর্থ থাকত না। কিন্তু ইসলামে স্পষ্টভাবে কিছু শ্রেণির নারীর সঙ্গে সহবাস নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটি দেখায় যে, যুদ্ধবন্দী হওয়া মাত্রই কোনো নারী যৌনসম্পর্কের জন্য বৈধ হয়ে যায় না।

মুশরিক দাসীদের সহিত সহবাসে নিষেধাজ্ঞাঃ

আল কুরআনে সুরা বাকারাহর ২২১ নং আয়াতে বলা হয়েছে –

وَ لَا تَنۡكِحُوا الۡمُشۡرِكٰتِ حَتّٰی یُؤۡمِنَّ ؕ

অর্থঃ "আর তোমরা মুশরিক নারীদের 'নিকাহ' করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে...

আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসির কুরতুবীতে বলা হয়েছে—

وَنَكَحَ أَصْلُهُ الْجِمَاعُ، وَيُسْتَعْمَلُ فِي التَّزَوُّجِ تَجَوُّزًا وَاتِّسَاعًا،

অর্থঃ “এবং "نَكَحَ" (নাকাহা) কথাটির মূল অর্থ হলো "সঙ্গম করা," তবে এটি রূপক অর্থে এবং ব্যাপক অর্থে "বিবাহ করা" অর্থেও ব্যবহার করা হয়।” (( তাফসির কুরতুবী, সুরা বাকারাহর ২২১ নং আয়াতের তাফসির, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৬৭ https://shamela.ws/book/20855/975 অথবা https://archive.is/wip/dpoDD (আর্কাইভকৃত) ))

ইমাম ইবনু কুদামা মাকদিসি(র.) তাঁর সুবিখ্যাত ‘আল মুগনি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন--

أَنَّ مَنْ حُرِّمَ نِكَاحُ حَرَائِرِهِمْ مِنْ الْمَجُوسِيَّات، وَسَائِرِ الْكَوَافِرِ سِوَى أَهْلِ الْكِتَابِ، لَا يُبَاحُ وَطْءُ الْإِمَاءِ مِنْهُنَّ بِمِلْكِ الْيَمِينِ. فِي قَوْل أَكْثَرِ أَهْلِ الْعِلْمِ، مِنْهُمْ؛ مُرَّةُ الْهَمْدَانِيُّ، وَالزُّهْرِيُّ، وَسَعِيدُ بْنُ جُبَيْرٍ، وَالْأَوْزَاعِيُّ، وَالثَّوْرِيُّ، وَأَبُو حَنِيفَةَ، وَمَالِكٌ، وَالشَّافِعِيُّ. وَقَالَ ابْنُ عَبْدِ الْبَرِّ: عَلَى هَذَا جَمَاعَةُ فُقَهَاءِ الْأَمْصَارِ، وَجُمْهُورُ الْعُلَمَاءِ، وَمَا خَالَفَهُ فَشُذُوذٌ لَا يُعَدُّ خِلَافًا.

অর্থঃ “যে সকল স্বাধীন নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম করা হয়েছে, যাদের মধ্যে আছে আহলে কিতাব ব্যতিত মাজুসী (Zoroastrians/অগ্নিপূজকদের) এবং অন্য সকল কাফির নারী। তাদের ক্ষেত্রে মালিকানার অধিকারেও দাসীদের সাথে সহবাস জায়েজ নয়। এটাই অধিকাংশ আলিমের বক্তব্য। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মুররাহ আল-হামদানি(র.), যুহরি(র.), সাঈদ বিন জুবাইর(র.), আওযায়ী(র.), সাওরি(র.), আবু হানিফা(র.), মালিক(র.) এবং শাফিঈ(র.)। ইবন আব্দুল বার(র.) বলেছেন: "এটাই বিভিন্ন অঞ্চলের ফকিহদের মত এবং অধিকাংশ আলিমের অভিমত। এর বিপরীত যে মত আছে, তা শুযুয (বিচ্ছিন্ন মত) এর অন্তর্ভুক্ত এবং সেটিকে কোনো মতপার্থক্য হিসেবেও গণ্য করা হয় না। (( আল মুগনি – ইবনু কুদামা মাকদিসি, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৩৪ https://shamela.ws/book/8463/2944 অথবা https://archive.is/wip/NCirL (আর্কাইভকৃত) ))

অন্যের দাসীর সাথেও সহবাস করা বৈধ নয়

ইমাম ইবনু কুদামা মাকদিসি(র.) তাঁর সুবিখ্যাত ‘আল মুগনী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, 

أَنَّ الْغَاصِبَ إذَا وَطِئَ الْجَارِيَةَ الْمَغْصُوبَةَ، فَهُوَ زَانٍ؛ لِأَنَّهَا لَيْسَتْ زَوْجَةً لَهُ وَلَا مِلْكَ يَمِينٍ، فَإِنْ كَانَ عَالِمًا بِالتَّحْرِيمِ، فَعَلَيْهِ حَدُّ الزِّنَى؛ لِأَنَّهُ لَا مِلْكَ لَهُ، وَلَا شُبْهَةَ مِلْكٍ، وَعَلَيْهِ مَهْرُ مِثْلِهَا، سَوَاءٌ كَانَتْ مُكْرَهَةً أَوْ مُطَاوِعَةً.

অর্থঃ “যদি কোনো জোরপূর্বক দখলকারী ব্যক্তি কোনো দাসীর সাথে (জোরপূর্বক) সহবাস করে, তবে সে একজন ব্যভিচারী। কারণ, সে তার স্ত্রী নয় এবং মালিকানাধীনও নয়। যদি সে এই কাজের নিষিদ্ধতা সম্পর্কে জ্ঞাত থাকে, তবে তার উপর ব্যভিচারের নির্ধারিত শাস্তি (হাদ্দ) প্রযোজ্য হবে। কারণ, তার মালিকানা নেই এবং কোনো ধরনের মালিকানার (আইনগত) সন্দেহও নেই। এছাড়া, তাকে ঐ দাসীর উপযুক্ত দেনমোহর (মাহর) প্রদান করতে হবে, তার সাথে বাধ্য হয়েই (সহবাস করা) হোক বা সম্মতিতে হোক।” (( ج5 - ص199 - كتاب المغني لابن قدامة ط مكتبة القاهرة - مسألة غصب جارية فوطئها وأولدها - المكتبة الشاملة অর্কাইভকৃত লিংকঃ ص199 - كتاب المغني لابن قدامة ط مكتبة القاهرة - مسألة غصب جارية فوطئها وأولدها - المكتبة الشاملة )) 

ইসলাম দাস-দাসীদের মুক্তির পথ উন্মুক্ত করেছে

হাদিসে এসেছে,

পরিচ্ছেদঃ ৫০/১. মুকাতাব বা চুক্তির ভিত্তিতে অর্থের কিস্তি প্রসঙ্গে। প্রতি বছর এক কিস্তি করে আদায় করা। 

আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ ‘‘তোমাদের এবং তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীদের মধ্যে কেউ তার মুক্তির জন্য চুক্তিপত্র লিখতে চাইলে তাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হও, যদি তোমরা ওদের মধ্যে মঙ্গলের সন্ধান পাও এবং আল্লাহ তোমাদের যে সম্পদ দিয়েছেন, তা হতে তোমরা ওদের দান করবে’’- (আন-নূর ৩২)।

রাওয়াহ (রহ.) বলেন, ইবনু জুরাইজ (রহ.) বর্ণনা করেন, আমি ‘আতা (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, যদি আমি জানতে পারি যে, তার (গোলামের) অর্থ-সম্পদ রয়েছে, তবে কি তার সাথে কিতাবের চুক্তি করা আমার জন্য ওয়াজিব হবে? তিনি বললেন, আমি তো ওয়াজিব ছাড়া অন্য কিছু মনে করি না। ‘আমর ইবনু দ্বীনার (রহ.) বলেন, আমি ‘আতা (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, এ মতামত কি আপনি (পূর্ববর্তী) কারো কাছ হতে বর্ণনা করছেন? তিনি বললেন, না। তারপর ‘আতা (রহ.) আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, মূসা ইবনু আনাস (রহ.) তাকে অবহিত করেছেন যে, আনাস (রাঃ)-এর কাছে তার ক্রীতদাস সীরীন মুকাতাব (চুক্তিবদ্ধ) হবার আবেদন জানাল। সে বিত্তশালী ছিল। কিন্তু আনাস (রাঃ) তাতে অস্বীকৃতি জানালেন। সীরীন তখন ‘উমার (রাঃ)-এর কাছে বিষয়টি উত্থাপন করল। ‘উমার (রাঃ) তখন তাকে [আনাস (রাঃ)-কে] বেত্রাঘাত করলেন এবং নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করলেন, ‘‘তোমরা তাদের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হও, যদি তোমরা তাদের মধ্যে মঙ্গলের সন্ধান পাও’’- (আন-নূর ৩৩)।


২৫৬০. ‘আয়িশাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, বারীরা (রাঃ) একবার মুকাতাবাতের সাহায্য চাইতে তাঁর কাছে আসলেন। প্রতিবছর এক ‘উকিয়া’ করে পাঁচ বছরে পাঁচ ‘উকিয়া’ তাকে পরিশোধ করতে হবে। তার প্রতি ‘আয়িশাহ (রাযি.) আগ্রহান্বিত হলেন। তাই তিনি বললেন, যদি আমি এককালীন মূল্য পরিশোধ করে দেই তবে কি তোমার মালিক তোমাকে বিক্রি করবে? তখন আমি তোমাকে মুক্ত করে দিব এবং তোমার ওয়ালার অধিকার আমার হবে। বারীরা (রাঃ) তার মালিকের কাছে গিয়ে উক্ত প্রস্তাব পেশ করলেন। কিন্তু তারা বলল, না; তবে যদি ওয়ালার অধিকার আমাদের হয়। ‘আয়িশাহ (রাযি.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর খিদমতে গেলাম এবং বিষয়টি তাঁকে বললাম। (রাবী বলেন) তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, তাকে খরিদ করে মুক্ত করে দাও। কেননা, ওয়ালা তারই হবে, যে মুক্ত করবে। তারপর তিনি দাঁড়িয়ে বললেন, মানুষের কী হল, তারা এমন সব শর্তারোপ করে, যা আল্লাহর কিতাবে নেই! আল্লাহর কিতাবে নেই এমন শর্ত কেউ আরোপ করলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। আল্লাহর দেয়া শর্তই সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য। (৪৫৬) (আধুনিক প্রকাশনীঃ কিতাবুল মুকাতাব অনুচ্ছেদ-১, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ  অনুচ্ছেদ ১৬০২) (( সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) | হাদিস: ২৫৬০ | Sahih al-Bukhari, Hadith No. 2560 )) 

কুরআন ও হাদিসে স্পষ্ট দেখা যায়, কোনো দাস বা দাসী যদি মুক্তি লাভ করতে চায় এবং মুকাতাব চুক্তির উপযুক্ত হয়, তাহলে তার জন্য মুক্তির ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, যদি ইসলামের উদ্দেশ্যই হতো যুদ্ধবন্দী নারীদের আজীবন যৌনদাসী হিসেবে রেখে দেওয়া, তাহলে তাদের মুক্তির জন্য এত সুস্পষ্ট আইন ও ব্যবস্থা কেন প্রণয়ন করা হলো? এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামের লক্ষ্য দাসপ্রথাকে স্থায়ী করা নয়; বরং ধীরে ধীরে দাস-দাসীদের মুক্তির বিভিন্ন পথ উন্মুক্ত করা।

উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, "যুদ্ধবন্দী" এবং "যৌনদাসী" এক জিনিস নয়। ইসলামী শরিয়তে যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে রাষ্ট্রপ্রধানের সিদ্ধান্ত, দাসত্বে পরিণত হওয়ার আইনগত প্রক্রিয়া, দাস-দাসীদের বিবাহের নির্দেশ, মুক্তির ব্যবস্থা এবং সহবাসের ক্ষেত্রে বিভিন্ন শর্ত ও বিধিনিষেধ সব মিলিয়ে প্রমাণ করে যে, "যুদ্ধবন্দী মানেই যৌনদাসী" এই প্রচলিত অভিযোগটি ইসলামী আইনের সঠিক প্রতিফলন নয়।

অনেক স্কলার কেন এমন ফতোয়া দিয়েছেন যে দাসীদের সাথে সহবাসে জোর জবরদস্তি করা যাবে?

বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন শায়খ আহমাদুল্লাহ (হাফি.) বৈধ দাসী কিংবা স্ত্রীর সাথে সহবাসের ক্ষেত্রে অনুমতি নেয়া জরুরী কিনা এ প্রসঙ্গে কী উত্তর দিয়েছেন তা দেখে নিন।

দাসীদের ক্ষেত্রে সহবাসের বিষয়ে যেসব স্কলার “জোর” বা “জবরদস্তি” শব্দ ব্যবহার করেছেন, তাদের বক্তব্যকে বুঝতে হলে এর প্রকৃত অর্থ ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি। এখানে “জোর” বলতে এমন কোনো জুলুম, নির্যাতন বা শারীরিক বাধ্যবাধকতা বোঝানো হয়নি, যার মাধ্যমে কারো ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে কষ্ট দেওয়া হবে। বরং এটি এমন এক ধরনের আবদারমূলক জোর, যা পারস্পরিক সম্পর্ক, ঘনিষ্ঠতা এবং বোঝাপড়ার ভিত্তিতে হয়ে থাকে।

যেমন, ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীর নিকট বৈধ অধিকার দাবি করতে পারেন, আবার স্ত্রীও স্বামীর নিকট তার অধিকার দাবি করতে পারেন। কিন্তু এই অধিকার প্রয়োগের অর্থ কখনোই স্ত্রীকে আঘাত করা, অপমান করা বা তার উপর জুলুম করা নয়। বরং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক যেহেতু ভালোবাসা, দয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত, তাই সেখানে কোনো বিষয়ে আবদার করা বা একে অপরের কাছে প্রত্যাশা প্রকাশ করার সুযোগ থাকে।

একইভাবে, ঐতিহাসিক দাসপ্রথার প্রেক্ষাপটে মনিব ও দাসীর সম্পর্ককে কেবল শত্রুতা বা নিপীড়নের সম্পর্ক হিসেবে দেখা হয়নি। ইসলামী বিধানের আলোচনায় দাসীর ভরণ-পোষণ, নিরাপত্তা ও মানবিক আচরণের দায়িত্ব মনিবের উপর আরোপ করা হয়েছে। ফলে এই সম্পর্কের মধ্যেও দায়িত্ব ও পারস্পরিক আচরণের একটি কাঠামো ছিল।

তবে এখানেও “জোর” শব্দটি কোনোভাবেই দাসীর উপর নির্যাতন, জবরদস্তি বা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর আচরণকে বৈধতা দেয় না। কোনো ধরনের জুলুম বা ক্ষতি করা ইসলামী নীতির পরিপন্থী। ইতোমধ্যে আমরা একাধিক স্কলার থেকে রেফারেন্স দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করেছি। যেসব স্কলার এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন, তাদের বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল সম্পর্কের ভেতরে অধিকার ও প্রত্যাশার বিষয়টি ব্যাখ্যা করা, নির্যাতন বা অন্যায় আচরণকে অনুমোদন দেওয়া নয়।

অতএব, দাসীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত “জোর” শব্দকে তার ঐতিহাসিক ও পারিভাষিক অর্থে বুঝতে হবে। এটিকে আধুনিক অর্থে সহিংস জবরদস্তি বা নিপীড়ন হিসেবে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয়।

দাস প্রথা সংক্রান্ত আরো লিখা পড়ুনঃ ইসলামে দাসীদের পর্দার বিধান; উমার (রাঃ) কি পর্দা করলে দাসীদের প্রহার করেতেন? 

Comments (1)

Alamin Hossain Aug 08, 2026 01:39 PM

এত ভালভাবে পুরা বিষয়টা ব্যাখা করা হয়েছে অকল্পনীয়। এরপর দাসপ্রথা নিয়ে কারো প্রশ্ন থাকবে না যদি সে সত্যবাদি হয়।ধন্যবাদ শান্ত ভাই

Leave a Comment