নবী ﷺ কেন ইবনু খাতালকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন?
অভিযোগের উৎস
সহিহ বুখারিতে আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে:
মক্কা বিজয়ের বছর আল্লাহর রাসূল ﷺ মাথায় লৌহ শিরস্ত্রাণ পরিহিত অবস্থায় মক্কায় প্রবেশ করেন। তিনি শিরস্ত্রাণটি খুলে ফেললে একজন ব্যক্তি এসে বললেন, “ইবনু খাতাল কাবার পর্দা ধরে আছে।” তখন রাসূল ﷺ বললেন, “তাকে হত্যা করো।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ১৮৪৬; ৩০৪৪; ৪২৮৬। সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৩৫৭।
এই হাদিসের ভিত্তিতে অমুসলিমদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়:
“একজন ব্যক্তি কাবার গিলাফ ধরে আশ্রয় নিয়েছিল। তারপরও মুহাম্মদ ﷺ তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন। এটা কি অমানবিক নয়?”
প্রশ্নটির উত্তর দিতে হলে প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে এই ঘটনাটি অত্যন্ত সংক্ষেপে এসেছে। সেখানে ইবনু খাতালের পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ডের ইতিহাস বর্ণনা করার উদ্দেশ্যে হাদিসটি আনা হয়নি। বরং হাদিসটি বিভিন্ন অধ্যায়ে মূলত মক্কা বিজয়, ইহরাম ছাড়া মক্কায় প্রবেশ এবং সংশ্লিষ্ট ফিকহি বিষয়ে এসেছে।
অতএব শুধু এই কয়েক লাইনের হাদিস পড়ে মনে হতে পারে, ইবনু খাতাল কোনো অপরাধ ছাড়াই কাবার পর্দা ধরে ছিল এবং তাকে হঠাৎ হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু সীরাত ও হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলো পড়লে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রেক্ষাপট সামনে আসে।
ইবনু খাতালকে কেন হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে?
ইবনু খাতাল প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। নবী ﷺ তাকে সদকা সংগ্রহের কাজে পাঠান। তার সঙ্গে একজন মুসলিম খাদেম/মাওলা ছিল। এক পর্যায়ে খাবার তৈরি না করার কারণে সে ঐ ব্যক্তিকে হত্যা করে। এরপর ইসলাম ত্যাগ করে মুশরিকদের কাছে ফিরে যায়। তার দুই গায়িকাও নবী ﷺ-কে বিদ্রূপ করে রচিত কবিতা বা ব্যঙ্গগান গাইত। (( Ibn Hisham, Al-sirah Al-nabawiya | السيرة النبوية لإبن هشام ))
ইমাম নববী সহিহ মুসলিমের শরহে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন,
সে ( ইবনু খাতাল ) ইসলাম থেকে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল এবং তার সেবক এক মুসলিমকে হত্যা করেছিল, এবং সে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিয়ে ব্যঙ্গ ও অপমান করত, এবং তার দুটি কায়না ছিল যারা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও মুসলিমদের ব্যঙ্গ নিয়ে গান করত। (( https://www.islamweb.net/ar/library/content/53/4003/ ))
অর্থাৎ, আলেমরা বলেছেন ইবনু খাতালের ক্ষেত্রে কয়েকটি অপরাধ একত্র হয়েছিল:
-
ইসলাম ত্যাগ বা রিদ্দাহ
-
একজন মুসলিম খাদেমকে হত্যা
-
নবী ﷺ-কে হিজা বা বিদ্রূপ ও অপমান করা
-
তার দুই গায়িকাকে দিয়ে নবী ﷺ ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গগান গাওয়ানো।
ইমাম ইবন হাজর আল আসকালানী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ফাতহুল বারী শরহ সহিহ আল বুখারি’-তে ইবন খাতালকে হত্যার কারণ আলোচনা করতে গিয়ে ইবন ইসহাক, আল ফাকিহী, ইবন আবদুল বার ও আল খাত্তাবিসহ পূর্ববর্তী আলেমদের বিভিন্ন বর্ণনা ও বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। তিনি সেখানে লিখেছেন:
“ইবন খাতালকে হত্যা করার কারণ এবং ‘যে মসজিদে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ’ এই বক্তব্যের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার কারণ হলো, ইবন ইসহাক মাগাযী গ্রন্থে যা বর্ণনা করেছেন,
তিনি বলেছেন: আমাকে আবদুল্লাহ ইবন আবি বকর এবং অন্যরা বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন মক্কায় প্রবেশ করেন, তখন বলেন:
“যে যুদ্ধ করবে তাকে ছাড়া কাউকে হত্যা করা হবে না, তবে কয়েকজন ব্যক্তি এর ব্যতিক্রম।”
তিনি তাদের নাম উল্লেখ করেন এবং বলেন:
“তোমরা তাদের হত্যা করো, যদিও তাদেরকে কাবার পর্দার নিচে পাও।”
তাদের মধ্যে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন খাতাল এবং আবদুল্লাহ ইবন সা‘দ।
ইবন খাতালকে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কারণ সে মুসলিম ছিল। রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে সদকা সংগ্রাহক হিসেবে পাঠিয়েছিলেন এবং তার সঙ্গে আনসারদের একজন ব্যক্তিকে পাঠিয়েছিলেন। তার সঙ্গে একজন মাওলা ছিল, যে তার সেবা করত এবং মুসলিম ছিল। তারা একটি স্থানে অবস্থান নিল। সে মাওলাকে একটি ছাগল জবাই করে তার জন্য খাবার প্রস্তুত করতে নির্দেশ দিল। এরপর সে ঘুমিয়ে পড়ল। জেগে উঠে দেখল সে তার জন্য কিছুই প্রস্তুত করেনি। তখন সে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে হত্যা করল। এরপর সে মুরতাদ হয়ে মুশরিক হয়ে গেল। তার দুইজন গায়িকা ছিল, যারা রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে ব্যঙ্গ করে রচিত কবিতা গাইত।
ফাকিহী ইবন জুরাইজের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ইবন আব্বাসের মাওলা বলেছেন:
“রাসুলুল্লাহ ﷺ আনসারদের একজন ব্যক্তি, মুযাইনা গোত্রের একজন ব্যক্তি এবং ইবন খাতালকে পাঠিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন: তোমরা ফিরে আসা পর্যন্ত আনসারি ব্যক্তির আনুগত্য করো। এরপর ইবন খাতাল আনসারি ব্যক্তিকে হত্যা করল এবং মুযানি ব্যক্তি পালিয়ে গেল। সে তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল যাদের রক্ত রাসুলুল্লাহ ﷺ মক্কা বিজয়ের দিন বৈধ ঘোষণা করেছিলেন।”
ইবন আবদুল বার বলেছেন:
“ইবন খাতালকে হত্যা করা হয়েছিল সে যে মুসলিমকে হত্যা করেছিল তার কিসাস হিসেবে।”
কিন্তু ইবন খাতাল এমন কাজগুলো করেছিল যেগুলো হত্যাকে আবশ্যক করে। তাই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, তাকে হত্যার কারণ ছিল গালি দেওয়া। …তবে খাত্তাবি বলেছেন:
“নবী ﷺ তাকে হত্যা করেছিলেন ইসলাম অবস্থায় সে যে অপরাধ করেছিল তার কারণে।”
ইবন আবদুল বার বলেছেন:
“তিনি তাকে সেই মুসলিমের রক্তের কিসাস হিসেবে হত্যা করেছিলেন, যার সঙ্গে সে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাকে হত্যা করেছিল, এরপর মুরতাদ হয়েছিল, যেমন পূর্বে বলা হয়েছে।” (( إسلام ويب - فتح الباري شرح صحيح البخاري - كتاب جزاء الصيد - باب دخول الحرم ومكة بغير إحرام- الجزء رقم4 ))
অর্থাৎ, ইবন ইসহাকের বর্ণনা উদ্ধৃত করে ইবন হাজর আল আসকালানী বলেন, তার সঙ্গে একজন মুসলিম মাওলা বা সেবকও ছিল। পথে এক স্থানে অবস্থান করার সময় ইবনু খাতাল তাকে একটি ছাগল জবাই করে খাবার তৈরি করতে বলে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম থেকে উঠে খাবার প্রস্তুত না দেখে সে ঐ মুসলিম ব্যক্তির ওপর আক্রমণ করে এবং তাকে হত্যা করে। এরপর সে ইসলাম ত্যাগ করে মুশরিকদের সঙ্গে যোগ দেয়, এবং রাসুল (সাঃ) কে নিয়ে গালমন্দ করেন। কাজেই, ঘটনাটি এমন নয় যে ইবনু খাতাল মক্কার একজন সাধারণ অমুসলিম ছিল এবং শুধুমাত্র ইসলাম গ্রহণ না করার কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। বরং সীরাতের বর্ণনায় তার অতীতে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধের কথা পাওয়া যায়।
ইবনে খালদুনের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অপরাধ: একজন মুসলিমকে হত্যা
ইবনু খাতালের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ ছিল ইচ্ছাকৃতভাবে একজন মুসলিমকে হত্যা করা। ইবন ইসহাকের বর্ণনায় নিহত ব্যক্তিকে তার মুসলিম মাওলা বা সেবক বলা হয়েছে। অন্যদিকে আল ফাকিহীর উদ্ধৃত আরেক বর্ণনায় বলা হয়েছে, রাসূল ﷺ একজন আনসারি, একজন মুযানি এবং ইবনু খাতালকে একত্রে পাঠিয়েছিলেন এবং আনসারি ব্যক্তির নির্দেশ মেনে চলতে বলেছিলেন। ঐ বর্ণনায় ইবনু খাতাল আনসারি ব্যক্তিকেই হত্যা করে এবং মুযানি ব্যক্তি পালিয়ে যায়।
ইবনু খাতালের হত্যা ছিল সে যে মুসলিমকে হত্যা করেছিল তার রক্তের কিসাস। আরও স্পষ্টভাবে ইবন হাজর পরে ইবন আবদুল বার-এর বক্তব্য উল্লেখ করেন যে, ইবনু খাতাল যে মুসলিম ব্যক্তির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাকে হত্যা করেছিল, তার কিসাস হিসেবেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল।
কাজেই, ঘটনাটিকে এভাবে উপস্থাপন করা যায় না যে:
“একজন লোক কাবা ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, মুহাম্মদ ﷺ তাকে পছন্দ করতেন না, তাই তাকে হত্যা করতে বললেন।” বরং প্রাচীন আলেমদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা অনুসারে সে ছিল একজন হত্যার আসামি, যার ওপর নিহত মুসলিমের রক্তের কিসাস কার্যকর করা হয়েছিল।
দ্বিতীয় অপরাধ: ইসলাম ত্যাগ করে শত্রুপক্ষে চলে যাওয়া
সীরাতের বর্ণনা অনুযায়ী মুসলিম ব্যক্তিকে হত্যা করার পর ইবনু খাতাল ইসলাম ত্যাগ করে মুশরিকদের কাছে চলে যায়।
ইবন হাজর ইবন ইসহাকের বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন:
সে মুসলিম ছিল, রাসূল ﷺ তাকে সদকা সংগ্রহের কাজে পাঠিয়েছিলেন। একজন মুসলিমকে হত্যা করার পর “ثم ارتد مشركا”, অর্থাৎ সে মুরতাদ হয়ে মুশরিক হয়ে যায়।
ইমাম নববীও একই বিষয় উল্লেখ করেছেন:
“সে ইসলাম থেকে মুরতাদ হয়েছিল…”
এখানে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগতভাবে ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তনের সাধারণ প্রশ্ন হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। বর্ণিত ঘটনাপ্রবাহে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার পর সে মুসলিম সমাজ ছেড়ে সেই মক্কান পক্ষের কাছে ফিরে যায়, যাদের সঙ্গে তখন মুসলিমদের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাত চলছিল। অর্থাৎ তার ক্ষেত্রে হত্যা, পক্ষত্যাগ এবং শত্রুপক্ষে প্রত্যাবর্তন একই ঘটনাপ্রবাহের অংশ ছিল।
তৃতীয় অপরাধ: রাসূল ﷺ-কে হিজা বা ব্যঙ্গ করা
ইবনু খাতালের আরও একটি কর্মকাণ্ডের কথা সীরাত ও শরহে পাওয়া যায়।
ইমাম নববী লিখেছেন, সে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে হিজা ও গালমন্দ করত এবং তার দুইজন কায়না বা গায়িকা ছিল, যারা নবী ﷺ এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে রচিত ব্যঙ্গাত্মক কবিতা গাইত। ইবন ইসহাকের বর্ণনা উদ্ধৃত করে ইবন হাজরও উল্লেখ করেন যে ইবনু খাতালের দুই গায়িকা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে নিয়ে রচিত হিজা বা ব্যঙ্গগান পরিবেশন করত।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। কেউ যেন ঘটনাটি থেকে সরাসরি এই সিদ্ধান্ত না নেয় যে: “ইবনু খাতালকে শুধু কবিতা লেখা বা নবী ﷺ-কে ব্যঙ্গ করার কারণেই হত্যা করা হয়েছিল।” কারণ ইবন হাজর নিজেই এমন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।
ইবন হাজরের গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ: ঠিক কোন অপরাধটির কারণে হত্যা হয়েছিল তা এককভাবে নির্ধারণ করা যায় না
ফাতহুল বারীতে ইবন হাজর আলোচনা করেছেন, কেউ কেউ ইবনু খাতালের ঘটনা দিয়ে রাসূল ﷺ-কে গালি দেওয়ার শাস্তির বিষয়ে দলিল দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
কিন্তু ইবন হাজর গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেন:
ইবনু খাতাল এমন একাধিক কাজ করেছিল যেগুলো মৃত্যুদণ্ডের কারণ হতে পারত। তাই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে শুধু রাসূল ﷺ-কে গালি দেওয়াই তার হত্যার নির্দিষ্ট কারণ ছিল।
তিনি এরপর আল খাত্তাবির বক্তব্য উল্লেখ করেন যে রাসূল ﷺ তাকে হত্যা করেছিলেন ইসলাম অবস্থায় সে যে অপরাধ করেছিল তার কারণে।
এর পরপরই ইবন আবদুল বার-এর ব্যাখ্যা তুলে ধরেন:
সে যে মুসলিমকে বিশ্বাসঘাতকতা করে হত্যা করেছিল, তার রক্তের কিসাস হিসেবে তাকে হত্যা করা হয়েছিল।
সুতরাং, ইবনু খাতালের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অপরাধের অভিযোগ ছিল। এর মধ্যে একজন মুসলিমকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং ইবন আবদুল বার ও আল খাত্তাবির ব্যাখ্যায় তার পূর্ববর্তী অপরাধ, বিশেষত হত্যাকাণ্ড, মৃত্যুদণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল।
কাজেই ঐতিহাসিক ঘটনা ও ক্লাসিক্যাল আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ইবনু খাতালের বিরুদ্ধে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে উল্লেখ করেছেন:
- সে ইসলাম ত্যাগ করেছিল।
- একজন মুসলিমকে হত্যা করেছিল, যে তার সেবা করত।
- রাসূল ﷺ-কে হিজা ও অপমান করত।
- তার দুই গায়িকা নবী ﷺ ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গগান গাইত।
অর্থাৎ, ইবনু খাতালের পরিচয় কোনো নিরপরাধ সাধারণ নাগরিক হিসেবে নয়। তার বিরুদ্ধে হত্যা এবং অন্যান্য গুরুতর অপরাধের অভিযোগ ছিল।
তাহলে কাবার গিলাফ ধরে থাকলেও তাকে কেন নিরাপত্তা দেওয়া হলো না?
এখানে দ্বিতীয় আপত্তি আসে:
“কাবা তো পবিত্র স্থান। সে যখন কাবার পর্দা ধরে আশ্রয় নিয়েছিল, তখন তাকে হত্যা করা হলো কেন?”
এখানেও পূর্ণ প্রেক্ষাপট জানা জরুরি। মক্কা বিজয়ের সময় রাসূল ﷺ সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাপক নিরাপত্তা ঘোষণা করেছিলেন। সহিহ মুসলিমে এসেছে, যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, যারা অস্ত্র ফেলে দেবে এবং যারা নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে থাকবে তারা নিরাপদ থাকবে। অর্থাৎ উদ্দেশ্য ছিল নির্বিচারে মক্কাবাসীকে হত্যা করা নয়। বরং বিপুল সংখ্যক মক্কাবাসী সাধারণ নিরাপত্তার আওতায় ছিল।
কিন্তু সীরাতের বর্ণনা অনুসারে অল্প কয়েকজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে এই সাধারণ নিরাপত্তা থেকে আগেই বাদ দেওয়া হয়েছিল। ইবনু খাতাল তাদের একজন। ইবন হাজর ইবন ইসহাকের বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন, মক্কায় প্রবেশের সময় নির্দেশ ছিল, সাধারণভাবে যে যুদ্ধ করবে তাকে ছাড়া কাউকে হত্যা করা হবে না, তবে কয়েকজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি এর ব্যতিক্রম। তাদের ব্যাপারে নির্দেশ ছিল, এমনকি কাবার পর্দার নিচে পাওয়া গেলেও তাদের বিরুদ্ধে নির্দেশ কার্যকর করতে হবে। ইবনু খাতাল সেই ব্যতিক্রমী ব্যক্তিদের একজন ছিল। ইমাম নববীও বলেন, সাধারণ নিরাপত্তার ঘোষণার মধ্যে ইবনু খাতাল অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তাকে এবং আরও কয়েকজনকে আগে থেকেই এর বাইরে রাখা হয়েছিল। (( (( إسلام ويب - فتح الباري شرح صحيح البخاري - كتاب جزاء الصيد - باب دخول الحرم ومكة بغير إحرام- الجزء رقم4 )) অতএব কাবার পর্দা ধরা নতুন করে তার জন্য বিচারিক দায়মুক্তি তৈরি করেনি।
তাহলে ঘটনাটি কি অমানবিক?
এখন মূল আপত্তিতে ফিরে আসা যাক। শুধু সহিহ বুখারির সংক্ষিপ্ত বর্ণনাটি বিচ্ছিন্নভাবে পড়লে ঘটনাটি খুব কঠোর মনে হতে পারে: “সে কাবার গিলাফ ধরে ছিল। নবী ﷺ বললেন, তাকে হত্যা করো।”
কিন্তু ঐতিহাসিক পটভূমি যুক্ত হলে চিত্রটি পরিবর্তিত হয়। ইবনু খাতালকে প্রাচীন মুসলিম উৎসগুলো এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছে যে: প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পেয়েছিল, একজন মুসলিমকে হত্যা করেছিল, এরপর পক্ষত্যাগ করে মুশরিকদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছিল।
এর মধ্যে ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগটি বিশেষভাবে গুরুতর। ইবন আবদুল বার তার মৃত্যুকে সরাসরি নিহত মুসলিমের কিসাস হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তাই ঘটনাটি হচ্ছে না:
“একজন নিরপরাধ ব্যক্তি কাবার পাশে দাঁড়িয়েছিল, আর নবী ﷺ বিনা কারণে তাকে হত্যা করলেন।” বরং ক্লাসিক্যাল উৎস অনুযায়ী এটি ছিল একজন পূর্বপরিচিত গুরুতর অপরাধীর বিরুদ্ধে পূর্বঘোষিত শাস্তি কার্যকরের ঘটনা। কাজেই এই ঘটনাকে কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই অমানবিক বলাটা যুক্তিযুক্ত নয়।
সুতরাং, সহিহ বুখারির, “ইবনু খাতাল কাবার পর্দা ধরে আছে।” রাসূল ﷺ বললেন, “তাকে হত্যা করো।” এই সংক্ষিপ্ত বর্ণনাকে পুরো ঘটনা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সীরাত এবং হাদিসের প্রাচীন ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলো থেকে জানা যায়, ইবনু খাতালের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ ছিল। বিশেষ করে একজন মুসলিমকে হত্যা করার ঘটনা তার মামলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইমাম নববী তার ক্ষেত্রে রিদ্দাহ, মুসলিম হত্যা এবং নবী ﷺ ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিজার কথা একত্রে উল্লেখ করেছেন।
আর ইবন হাজর ফাতহুল বারীতে ইবন ইসহাক, ফাকিহী, ইবন আবদুল বার এবং খাত্তাবির বক্তব্য পর্যালোচনা করে দেখান যে তার ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের একাধিক কারণ উপস্থিত ছিল। এজন্য শুধু গালি দেওয়াকেই তার মৃত্যুর নিশ্চিত কারণ বলা যায় না। ইবন আবদুল বার বিশেষভাবে তার হাতে নিহত মুসলিম ব্যক্তির কিসাসকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অতএব ঘটনাটির অধিক সঠিক সারসংক্ষেপ হলো:
ইবনু খাতাল কোনো নিরপরাধ মক্কাবাসী ছিলেন না যাকে কেবল নবী ﷺ-কে সমালোচনা করা, ইসলাম ত্যাগ করা বা কাবার পাশে পাওয়া যাওয়ার কারণে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছিল। ক্লাসিক্যাল উৎস অনুযায়ী তিনি একজন মুসলিমকে হত্যা করেছিলেন, পরে পক্ষত্যাগ করেছিলেন এবং আরও শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছিলেন। মক্কা বিজয়ের সাধারণ নিরাপত্তা ঘোষণার আগেই তাকে নির্দিষ্টভাবে ব্যতিক্রম করা হয়েছিল। ইবন আবদুল বারসহ আলেমদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা হলো, তার ওপর নিহত মুসলিমের কিসাস কার্যকর করা হয়েছিল।
সুতরাং হাদিসটিকে প্রসঙ্গবিচ্ছিন্নভাবে “মুহাম্মদ ﷺ একজন আশ্রয়প্রার্থী নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলেন” বলে উপস্থাপন করা ঐতিহাসিকভাবে অসম্পূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর।